আমার এই ক্ষুদ্র জীবনে বন্ধুদের সাথে ঘুরাঘুরি শুরুটা হয় সিলেট দিয়েই। ঢাকার বাইরে পরিবারের সদস্য ছাড়া ২০১০ সালে তিন বন্ধু মিলে সিলেট ঘুরাঘুরি দিয়েই ভ্রমণ জগতে প্রবেশ করা। সেই বছর তিন বন্ধু মিলে সিলেটের বিখ্যাত চা বাগান মালিনীছড়া, জাফলং এবং মাধবকুন্ড ঘুরে আসি। এরপর ২০১৪ সালে সিলেট ভ্রমণের মাধ্যমেই সাইক্লিং এবং ক্যাম্পিং জগতে অর্থাৎ মোটামুটি বেশ এডভেঞ্চারময় ভ্রমণ জগতে প্রবেশ করা। ২০১৪ সালে সেই সিলেট ভ্রমণে প্রায় ২৪ জন সাইক্লিস্ট মিলে আমরা সাড়ে তিনশ কিলোর মত প্যাডেলিং করে ঘুরে বেড়িয়েছি, শ্রীমঙ্গল এর লাউয়াছড়া, মাধবপুর লেক, হাকালুকি হাওড়, খাদিমনগর জাতীয় উদ্যান, বিছানাকান্দি, পাংথুমাই, সংগ্রামপুঞ্জি, জাফলং।

আমাদের সেই অভিজ্ঞতা নিয়ে ব্লগ পোস্ট যে পাওয়াগুলো বন্দি হল স্মৃতির ফ্রেমে

ঠিক পরের বছর ২০১৫ সালে আবার তিন বন্ধু মিলে সিলেটের উদ্দেশ্যে রওনা, এই ট্যুরে অবশ্য হামহাম জলপ্রপাত, রাতারগুল জলাবন এবং বিছানাকান্দি ঘুরেছি শুধু। তারপরেও কেনো যেনো সিলেটের মায়া কাটছেই না। এইতো কিছুদিন আগে NSU Adventure Club (Unofficial) এর উদ্যোগে আবারো সিলেট যাত্রা। যদিও উদ্দেশ্য ছিলো পাথারিয়া আর ভোলাগঞ্জ ঘুরে আসা কিন্তু স্থানীয় সমস্যার কারনে পাথারিয়া প্ল্যান বাতিল করে শুধুমাত্র ভোলাগঞ্জের দিকেই যেতে হয়েছে। দুইদিনের এই ট্যুরে আমরা ঘুরে বেড়িয়েছি ভোলাগঞ্জের উতমা ছড়া, তুরং ছড়া, বড়পুঞ্জি বর্ডার হাট, বিশেষ কোয়েরি, সাদা পাথর, রাতারগুল জলাবন, খাদিমনগর জাতীয় উদ্যান, লালাখাল এবং ৩ং নামে লালাখালের সীমান্তবর্তী একটি গ্রাম।

হামহাম, রাতারগুল আর বিছানাকান্দির অভিজ্ঞতা নিয়ে ব্লগ পোস্ট যেখানে সবুজ হাতছানির অন্ত নেই

এখন এই নিরবিচ্ছিন্ন ভূমিকায় ইতি টেনে একটু ভেতরে দিকে প্রবেশ করছি। বিগত এক বছর ধরে প্রতি সেমিস্টার ব্রেকেই  এর উদ্যোগে বিভিন্ন ট্যুরের প্ল্যান করা হয়ে থাকে। তাই এর ব্যতিক্রম লাস্ট সেমিস্টারেও হয়নি। গত ৫ই মে রাত এগারটার বাসে করে আমরা ৮ জন সিলেটের উদ্দেশ্যে রওনা হয়। প্ল্যান অনুযায়ী প্রথমদিন আমাদের সিলেটের ভোলাগঞ্জ ঘুরে বেড়ানোর কথা। তবে সিলেট থেকে ভোলাগঞ্জের সড়ক পথ যেনো এক একটি মৃত্যুকূপ। তবে যতই মৃত্যুকূপ হোক না কেনো ভোলাগঞ্জের উতমা ছড়া, তুরং ছড়া, সাদা পাথর এর সৌন্দর্য্য আপনার প্রায় ৪০ কিলোমিটার এভ্রোথেব্রো রাস্তার কষ্টটাকে সার্থক করতে বাধ্য।

 NSU Adventure Club (Unofficial) -এর দ্বিতীয় ইভেন্টে সম্পর্কিত ব্লগ পোস্টসমূহঃ

দ্বীপ উপকূল ঘুরে ফিরে প্রবালের দেশে – পর্ব এক
দ্বীপ উপকূল ঘুরে ফিরে প্রবালের দেশে – পর্ব দুই
দ্বীপ উপকূল ঘুরে ফিরে প্রবালের দেশে – পর্ব তিন
দ্বীপ উপকূল ঘুরে ফিরে প্রবালের দেশে – পর্ব চার
দ্বীপ উপকূল ঘুরে ফিরে প্রবালের দেশে – শেষ পর্ব

রাত এগারটার বাসে সিলেটের উদ্দেশ্যে রওনা দেবার কথা থাকলেও সেই বাস আসে সাড়ে এগারটায়। ৮ জন সদস্যদের মধ্যে আমরা ৬ জন সায়দাবাদ বাস টার্মিনাল থেকে বাসে উঠে আর অপর দুজন চিটাগাংরোড কাউন্টার থেকে আমাদের সাথে জয়েন করে। তবে বলা বাহুল্য এই ৮ জনের মধ্যে একজনের ডেডিকেশন এতোটাই ছিলো যে, সেদিন বিকালে সে, চিটাগাং থেকে ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা হয়ে, আমাদের সাথে সিলেট যাওয়ার জন্য সেদিন রাতেই আমাদের সাথে সিলেটের উদ্দেশ্যে রওনা হয়।

প্রায় সাড়ে পাঁচ ঘন্টার জার্নি শেষে আমরা সিলেটের কদমতলী বাস স্ট্যান্ডে পৌছাই। তখন প্রায় ভোর চারটা বেজে ৪৫ মিনিট। সূর্য্যের হালকা আভা দেখা যাচ্ছে। যেহেতু ভোলাগঞ্জের রাস্তার অবস্থা ভালো না, তার উপর ভোলাগঞ্জের অনেকগুলো জায়গা আমাদের একদিনে ঘুরতে হবে, তাই আমরা দেরি না করে ঠিক করি কদমতলী থেকেই ভোলাগঞ্জের সিএনজি রিসার্ভ করবো। যেহেতু আমরা সংখ্যায় আটজন সেহেতু মিনিমাম দুটি সিএনজি রিসার্ভ তো করতেই হবে। পূর্বেই আমরা ভোলাগঞ্জের লোকাল সিএনজি ভাড়া সম্পর্কে অবগত ছিলাম, তারপরেও কদমতলী বাস স্ট্যান্ডে এক সিএনজি ড্রাইভাবের সাথে কথা বললাম ভোলাগঞ্জ যাবে কি না, এক কথাতেই রাজি হয়ে গেলো। আর দুই সিএনজি রিজার্ভ ভাড়া বললো ৩০০০ টাকা। একদম মেঘ না চাইতেই যেনো বৃষ্টি হয় হয় অবস্থা। উল্লেখ্য, ভোলাগঞ্জের চরার বাজার পর্যন্ত লোকাল সিএনজি ভাড়াই জনপ্রতি ২৮০ টাকা করে, যেখানে দুই সিএনজির লোকাল ভাড়াই আসে ৫৬০০ টাকা, যেখানে ৩০০০ টাকা মাত্র দুই সিএনজি। কিছুটা অবাক হলাম, কিন্তু কমে পেয়ে আর কথা না বাড়িয়ে উঠে পড়লাম।

পরে এক বন্ধু বললো, সিএনজি ড্রাইভার বারবার বিছানাকান্দি বলছে, তারপর কনফার্ম হওয়ার জন্য সিএনজি ড্রাইভারকে আবার জিজ্ঞেস করলাম, এইবার সিএনজি ড্রাইভারও বললো বিছানাকান্দির কথা। উনাদের সাথে কথা শুরু হয়েছিলো ভোলাগঞ্জ দিয়ে সেটাকে তারা বিছানাকান্দি বানিয়ে ফেলছে। এদিক সেদিক খানিকটা কথা বলে বুঝলাম, কদমতলী থেকে ভোলাগঞ্জের সিএনজি পাওয়া যাবে না, তাই লেগুনাতে করে জনপ্রতি ২০ টাকা ভাড়া দিয়ে আম্বরখানা চলে গেলাম।

আম্বরখানা নামা মাত্রই ভোলাগঞ্জের কথা বলাতে এক সিএনজি মামা আমাদের সাথে বেশ আপ্যায়ন সহযোগে কথা বলছিলেন। তিনি বলছিলেন, আপনারা লোকাল ভাড়া যা তাই দিবেন। তাই আমরাও দর কষাকষিতে না গিয়ে রাজি হয়ে গেলাম। জনপ্রতি ২৮০ টাকা করে, এবং তারা আমাদের একদম উতমা ছড়ার মাথা পর্যন্ত নিয়ে যাবেন এবং আশেপাশে যা কিছু আছে সব ঘুরিয়ে আনবেন। আমরাও বেশ খুশী। সকাল সাড়ে পাচটার দিকে সিলেটের আম্বরখানা থেকে আমাদের যাত্রা শুরু হয় ভোলাগঞ্জের উদ্দেশ্যে। মালিনীছড়া চা বাগান পেড়িয়ে, এয়ারপোর্টের পেছন দিকের রাস্তা দিয়ে যতই সামনে আগাতে লাগলাম, রাস্তা ততই ভয়ংকর রূপ ধারন করতে লাগলো। মাঝে মাঝে মনে হলো এর থেকে আমাদের ঢাকার মালিবাগ-মৌচাকের রাস্তাও ঢেরগুণ ভালো। সিএনজি মামার সাথে কথা বলে বুঝতে পারলাম, এর থেকেও খারাপ রাস্তা সামনে অপেক্ষা করছে আর এইরকম খারাপ রাস্তায় প্রায় ৪০ কিলোমিটারের মত অতিক্রম করতে হবে। তাই আমরা সবাই যথেষ্ঠ মনোবল শক্ত করলাম বাকিটা পথ অতিক্রম করার জন্য।

ভোলাগঞ্জের রাস্তার অবস্থা বেহাল হলেও, চারপাশের মনোরম প্রাকৃতিক দৃশ্যতে মুগ্ধ হতে বাধ্য
ভোলাগঞ্জের রাস্তার অবস্থা বেহাল হলেও, চারপাশের মনোরম প্রাকৃতিক দৃশ্যতে মুগ্ধ হতে বাধ্য

বেশ কিছুদূর যাওয়ার পর দেখলাম রাস্তা বন্ধ। ভাঙ্গা রাস্তার কারনে দুইটা ট্রাক দুইদিক দিয়ে আটকে আছে। পেছনে গাড়ি না সামনে আসতে পারছে না সামনের গাড়ি যেতে পারছে। ততক্ষনে মনের মধ্যে আতংক তৈরী হয়ে গিয়েছে, এইবার বোধহয় ভোলাগঞ্জ যাওয়া হবেই না। এখনই হয়তো সিএনজি মামা বলবেন, মামা চলেন যাইগা, আজকে অইদিকে যাওয়া সম্ভব না। কিন্তু সব ধরনের আতংক ভুল প্রমানিত করে, ট্রাক দুটোকে আধা ঘন্টার মধ্যে সরানো হলো এবং এক সাইডের রাস্তা ক্লিয়ার করা হলো আর আমরাও স্বস্তি ফিরে পেলাম।

প্রায় দুই থেকে আড়াই ঘন্টা ভাঙ্গা রাস্তায় সিএনজি জার্নি শেষে আমরা চরার বাজারে পৌছালাম। সেখানে সকালের নাস্তা হিসেবে খেয়ে নিলাম সেই বাজারের বিখ্যাত আখনি (যা প্রচলিত বাংলায় তেহারি)। চা-পান করে রওনা দিলাম উতমা ছড়ার উদ্দেশ্যে। আমাদের দুই সুপার হিরো সিএনজি মামার দক্ষতায় আমরা একদম উতমা ছড়ার কাছাকাছি চলে গেলাম। সিএনজি থেকে নেমে উতমা ছড়ার বেশ খানিকটা ভেতরে যখনই অগ্রসর হতে নিচ্ছিলাম, তখন দূর থেকে বিজিবি চিতকার করে নিষেধ করছে অইদিকে না যেতে, অইদিকে নাকি ভারতের সীমান্ত। তাই আর আমরা রিস্ক নিয়ে ভেতরে দিকে যাইনি।

উতমা ছড়া, যদিও পানি তুলনামূলক কম ছিল
উতমা ছড়া, যদিও পানি তুলনামূলক কম ছিল

উতমা ছড়ায় বেশ খানিকটা সময় কাটিয়ে ক্লাস থ্রি পড়ুয়া স্থানীয় বাংলার নায়ক রিয়াজের সহয়তায় আমরা তুরং ছড়ার উদ্দেশ্যে রওনা হই। উতমা ছড়া থেকে তুরং ছড়া হেটে যেতে প্রায় ৩০-৩৫ মিনিটের পথ। সীমান্তবর্তী উতমা গ্রামের ভেতর দিয়ে আমরা সীমান্তবর্তী প্রতিবেশী গ্রাম তুরং-এ যাই, সেখানে গিয়ে তুরং ছড়া দেখে একেকজন পানিতে লাফিয়ে পরার অবস্থা। উল্লেখ্য এই উতমা ছড়া এবং তুরং ছড়া দুটো ছড়ার পানির উৎসই ভারতের পাহাড়ি ঝর্না। এছাড়া বিদ্যুৎহীন এই দুটো গ্রামের মানুষের প্রধান জীবিকাই পাথর উত্তোলন এবং সংগ্রহ। যদিও এখানে স্থানীয় মানুষ নেই বললেই চলে, বেশীরভাগই মানুষই বহিরাগত। শুধুমাত্র জীবিকার তাগিদেই এই গ্রামে তাদের বসবাস। পাথরের ব্যবসা ছাড়াও ভারতের সীমান্তবর্তী খাসিয়া গ্রামগুলো থেকে সংগ্রিহীত ফল, সুপারি, কাঠ ইত্যাদিও কেনা-বেচার জীবিকাও মানুষ করে থাকে।

তুরং ছড়ায় আমরা
তুরং ছড়ায় আমরা

বেশ কিছুটা সময় তুরং ছড়ায় কাটিয়ে, সেখান থেকে ফেরার পথে ফরমালিন মুক্ত কাঠালের লোভ সামলাতে পারলাম না। তাই স্থানীয় এক বাড়ি থেকে নায়ক রিয়াজের সহযোগিতায় কিনে ফেললাম কাঠাল। বলাবাহুল্য, এই কাঠাল ভারতের পাহাড়েই জন্মে, সেখান থেকে খাসিয়ারা বাংলাদেশীদের কাছে কম দামে বিক্রি করে।

উতমা ছড়া, তুরং ছড়া ঘুরে ফেরার পথে চলে গেলাম বড়পুঞ্জি (যতটুকু মনে পরে নামটা এইরকমই ছিলো) বর্ডার হাটে। সাধারনত একদিন অন্তর অন্তর সপ্তাহে তিনদিন সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত হাট চলে। এটি মূলত নো ম্যানস ল্যান্ড হিসেবেও পরিচিত। তবে নির্দিষ্ট কিছুদিনে বড় হাট বসে, সেই হাট আবার ভারতে বসে। তবে সেদিন বাংলাদেশীরাও হাটে প্রবেশ করতে পারে।

আমরা যেদিন গিয়েছিলাম সেদিন হাটের বন্ধের দিন। আমরা সীমানা অতিক্রম করে নো ম্যানস ল্যান্ডের হাটে ঢুকতেই সামান্য দূর থেকে কয়েকজন বিএসএফ চিল্লাপাল্লা শুরু করে দিলো যেনো বের হয়ে যাই এখান থেকে। তাই বের হয়ে গেলাম সেখান থেকে।

বড়পুঞ্জির বর্ডার হাটের প্রবেশ পথ
বড়পুঞ্জি বর্ডার হাটের প্রবেশ পথ

বড়পুঞ্জি বর্ডার হাট ঘুরে আমরা সরাসরি রওনা হলাম সাদা পাথরের উদ্দেশ্যে। সাদা পাথরে যাওয়ার জন্য কোম্পানীগঞ্জ বাজারের ঘাট থেকে নৌকা আছে। ৬০০ টাকার বিনিময়ে নৌকা ঠিক করলাম, আমাদের সাদা পাথর ঘুরিয়ে আনবে। তবে কিছুদূর যাওয়ার পর বিজিবির বাশির আওয়াজে নৌকা থামাতে হলো। সাদা পাথর এলাকাটা এখনোও রেস্ট্রিক্টেড। বিজিবির অনুমতি ছাড়া সেখানে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। আমাদের সিএনজি মামা আমাদের পক্ষ হতে বিজিবির কাছে গিয়ে ৪০ মিনিটের জন্য সেই এলাকায় অবস্থানের অনুমতি নিয়ে আসেন। আমরা অনুমতি পেয়ে নৌকা নিয়ে সাদা পাথর এলাকায় প্রবেশ করি।

সাদা পাথর এলাকায় প্রবেশের পর ভোলাগঞ্জে আসা যে স্বার্থক তা মনে হলো। আমার বিশ্বাস, কেউ যদি জাফলং এর আগে বিছানাকান্দি ঘুরে আসে, তখন পরবর্তীতে যেমন তার জাফলং অতটা আকর্ষনীয় মনে হবে না, ঠিক তেমনি, কেউ যদি বিছানাকান্দির আগে ভোলাগঞ্জের সাদা পাথর ঘুরে আসে, ঠিক তেমনি পরবর্তীতে তার কাছে বিছানাকান্দিকেও অতটা আকর্ষনীয় মনে হবে না। নো অফেন্স প্লিজ। এটা সম্পূর্ন ব্যক্তিগত মতামত।

অপরূপ সাদা পাথর
অপরূপ সাদা পাথর

কোম্পানীগঞ্জ বাজারের ঘাটে গেলেই পরিত্যক্ত রোপওয়ে দেখা যায়। সিএনজি মামার ভাষ্যমতে, ব্রিটিশ আমলে নাকি এই রোপওয়ের মাধ্যমে ভারত থেকে চুনাপাথর সরাসরি লাপাস সিমেন্ট ফ্যাক্টরিতে আমদানী করা হত।

সাদা পাথর এলাকাটি সত্যিই মনোমুগ্ধকর। পুরো এলাকাটির এক পাশ জুরে বিস্তির্ন সাদা পাথরের সমারোহ। দেখে মনে হবে, কোনো বিশাল বুনো পাখির ডিম ছড়িয়ে আছে। সাদা পাথর এলাকায় বেশ খানিকটা সময় কাটিয়ে বিকেল পাচটার দিকে রওনা হলাম সিলেটের উদ্দেশ্যে। অভিশপ্ত সেই ভাঙ্গা রাস্তাটাকে এখন আর অতটা অভিশপ্ত মনে হচ্ছে না। ভোলাগঞ্জের সৌন্দর্য্যে মুগ্ধ মন যেনো শরীরের ক্লান্তিটাকে ভুলিয়ে দিয়েছে। প্রায় রাত আটটায় আমরা সিলেটের আম্বরখানায় পৌছালাম। সিএনজি মামাদের আন্তরিকতা আমাদের মুগ্ধ করেছিলে। কতটা আন্তরিক মানুষ ছিলেন তারা, বলে বুঝানো যাবে না। এমনকি ভাড়া দেয়ার সময়ও তারা অতিরিক্ত টাকা দাবি করেননি, বরং আমরা খুশী হয়েই ৬০০০ টাকা মিল করে দিয়ে এসেছিলাম।

আম্বরখানা নামার পর, সারাদিনের সকল ক্লান্তি আর ক্ষুদা যেনো ভর করেছে। তাই যতটা সম্ভব দ্রুত হোটেল খোজা শুরু করি। এর আগে যতবার সিলেট আসা হয়েছে, ততবারই মাজার গেইটের আশেপাশের হোটেলেই উঠেছি। তবে এবার আম্বরখানার পলাশ হোটেলে উঠলাম। এক রাতের জন্য চার বেডের দুটো রুম নিলাম ৩২০০ টাকায়। হোটেলে গিয়ে ফ্রেশ হয়ে বেরিয়ে পড়লাম খাবারের সন্ধানে। ততক্ষনে সাড়ে নয়টা বেজে গেছে। লোকমুখে বলা আছে, সিলেটে এসে পাঁচ ভাই আর পানসিতে না খেলে নাকি সিলেটে আসার ষোলকলা পূর্ন হয় না। তাই চলে গেলাম পাঁচ ভাইতে। সেখানে ভরপেট উদর পূর্তি করে যেই হোটেলে ফিরছি অমনি তুমুল ঝড়ের কবলে। সিলেটে আসবো আর বৃষ্টির দেখা মিলবে না তা তো হয় না। ঝড়-বৃষ্টি উপেক্ষা করেই হোটেলে ফিরেছি। ফিরে এসেই সারাদিনের ক্লান্ত শরীর আর হাজারো সুন্দর স্মৃতি নিয়ে মাথাটাকে হোটেলের নরম বালিশে এলিয়ে দিয়েই ঘুমের রাজ্যে প্রবেশ করতে বিন্দুমাত্র দেরিটুকু হয়নি।


সংযোজনঃ

সিলেটের আম্বরখানা থেকে রিজার্ভ সিএনজি ছাড়াও লোকালভাবে ভোলাগঞ্জ যাওয়া যায়, সেক্ষেত্রে জনপ্রতি ২৫০ টাকায় আম্বরখানা থেকে সিএনজিতে করে কোম্পানীগঞ্জ বাজার, কোম্পানীগঞ্জ বাজার থেকে জনপ্রতি ৩০ টাকায় সিএনজিতে চরার বাজার। চরার বাজার থেকে ১৫-২০ মিনিট হেটে উতমা ছড়া এবং উতমা ছড়া থেকে স্থানীয় মানুষের সহযোগিতায় ৩০-৩৫ মিনিট হেটে তুরং ছড়া যাওয়া সম্ভব। আর সাদা পাথর যেতে হলে, কোম্পানীগঞ্জ বাজার থেকে নৌকা রিজার্ভ করে এবং বিজিবির অনুমতি সাপেক্ষে যেতে হবে। এছাড়াও বর্ষা মৌসুমে, সিলেটের আম্বরখানা থেকে সিএনজি করে বাধাঘাট, সেখান থেকে নৌকা রিজার্ভ করেও যাওয়া যায়। তবে পানিপথে সময় তুলনামূলক বেশী লাগে। সড়ক পথে ভোলাগঞ্জ যেতে দুটো বিষয় অবশ্যই মাথায় রাখবেন, সকাল আটটার আগে অবশ্যই সিএনজি করে ভোলাগঞ্জের উদ্দেশ্যে রওনা হবেন, না হলে ট্রাকের জ্যামে পড়তে পারেন। আর ভোলাগঞ্জ থেকে লোকাল সিএনজি করে সিলেট আসতে চাইলে অবশ্যই বিকাল চারটার আগে রওনা হবেন, তা না হলে সিএনজি পাওয়ার সম্ভাবনা কম। আর রিজার্ভ সিএনজির ক্ষেত্রে অবশ্যই বিকাল পাচটার মধ্যে ব্যাক করবেন, ঐ রোডে নাকি মাঝে মধ্যে রাতে ছিনতাই এর ঘটনা ঘটে থাকে।

তথ্যে যেকোনো ধরনের ভুল এবং অসঙ্গতি খুজে পেলে অবশ্যই মন্তব্য করবেন। আমি সংযোজন/বিয়োজন করে দিবো।

তুরং গ্রামে আমরা, আর পিছনে সামান্য এগুলেই ভারত
তুরং গ্রামে আমরা, আর পিছনে খানিকটা এগুলেই ভারতের সীমানা

পরের পর্বটি পড়তে এখানে ক্লিক করুন…