প্রথম পর্বের পর…

ঘুরাঘুরির ক্ষেত্রে আমি সবসময়ই আমার প্রিয় ঘুমটাকে ছাড় দিতে রাজি আছি। তাই ভোর সাড়ে পাচটায় উঠে পড়ি। বাকিদের ডাকাডাকি এবং সবার রেডি হয়ে হোটেলে চেক আউট করে বের হতে হতে সকাল প্রায় সাতটা। একদিনের জন্য হোটেল নিয়েছিলাম, আজ সারাদিন ঘুরে রাতের বাসে করে ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা হবো। তাই আর দেরি না করে হাটতে হাটতে আম্বরখানা থেকে মাজার গেটে গেলাম। সেখান থেকে সিলেট থেকে ঢাকার উদ্দেশ্যে ছেড়ে যাওয়া সর্বশেষ বাসের (রাত একটা) টিকিট কাটলাম। বাসের টিকিট কেটে স্থানীয় এক হোটেলে খাসির ভুনা খিচুরি দিয়ে উদরপূর্তি ঘটিয়েই দুইটা সিএনজি ৩৪০০ টাকা বিনিময়ে রিজার্ভ করে নিলাম সারাদিনের জন্য। যদিও সিএনজি মামা সারাদিন ঘুরিয়ে এনে নামিয়ে দেয়ার সময় অনেক কাহিনী করে ২০০ টাকা বেশী নিছিলো। সে যাই হোক, প্ল্যান অনুযায়ী আমরা প্রথমেই চলে গেলাম রাতারগুল জলাবনে। কিন্তু গিয়ে তো দালালের খপ্পরে।

আমার কাছে মনে হয় এই একটা জায়গাতেই মনে হয় দালালের খপ্পরে কম বেশী সবাইকেই পড়তে হয়। শেষবার যখন এসেছিলাম সেবারও দালালের মাধ্যমেই নৌকা ঠিক করতে হয়েছিলো এইবারও তার ব্যতিক্রম হয়নি। আমরা আটজন দেখে দুই নৌকা নাকি নিতেই হবে। বড় নৌকা ছিলো কিন্তু সেটা তারা দিবে না। কি আর করার অনেক দর কষাকষির পর দুই নৌকা ১৬০০ টাকা বিনিময়ে ঠিক করলাম।

তবে একটা জিনিস বেশ ভালো লেগেছে এখন নাকি ইঞ্জিন নৌকা বনের ভেতরে চলা নিষেধ। শেষ যে বার এসেছিলাম সেবার ইঞ্জিন নৌকা করেই গিয়েছিলাম। দাঁড় বাওয়া নৌকায় করে আমরা মিনিট চল্লিশের ভেতর বনের মধ্যে ঢুকে যাই। আস্তে আস্তে গভীর বনে। বনের সৌন্দর্য্যের হাতছানিতে সামনে এগুতে এগুতে ওয়াচ টাওয়ারের কাছাকাছি চলে আসি। ওয়াচ টাওয়ারের উপরে উঠে বেশ কিছুটা সময় ধরে বনের সৌন্দর্য্য সবাই মিলে অবলোকন করছে। কেউ বা আবার ছবি তোলায় ব্যস্ত।

রাতারগুল জলাবনের ওয়াচ টাওয়ার থেকে একটি কমন শট
রাতারগুল জলাবনের ওয়াচ টাওয়ার থেকে একটি কমন শট

শেষ যেভাব এসেছিলাম সেবার নৌকা নিয়ে বনের ভেতরে ঢুকা যায়নি, কারন বনের ভেতর অতটা পানি ছিলো না। আর ওয়াচ টাওয়ারেও উঠতে পারি নাই, কেননা এদিকটায় কাদায় ভরপুর ছিলো। আসলে শুকনো মৌসুমে আর বর্ষা মৌসুমে রাতারগুলের দুই রকম সৌন্দর্য্য দেখা যায়। দুটো সৌন্দর্য্যই একেকভাবে সুন্দর।

তবে বনের ভেতর ইঞ্জিন নৌকা ঢুকতে না দেয়ায় যেই ভালো উদ্যোগ সংশ্লিষ্ট কর্তুপক্ষ নিয়েছেন ঠিক তেমনি ওয়াচ টাওয়ারের নিচে চানাচুর আর চিপসের দোকান বসিয়ে তেমনি খারাপ একটি কাজও করছেন।

রাতারগুল জলাবনের ভেতরে
রাতারগুল জলাবনের ভেতরে

বেশ খানিকটা সময় ওয়াচ টাওয়ারে কাটিয়ে এবার ফেরার পালা, ফেরার আগে বনের বুনো মাটিতে কিছুক্ষন খালি পায়ে না হেটে আসা ঠিক হবে না। তাই একটা শুকনো জায়গা দেখে নৌকা থামিয়ে বেশ কিছুক্ষন ঘুরে ফিরে আবার নৌকায় উঠে ঘাটে চলে এলাম। মাঝির হাতে ১৬০০ টাকার চুক্তি গুচিয়ে দিয়ে সিএনজি করে এইবার রওনা হলাম লালাখালের উদ্দেশ্যে। খাদিমনগর চা বাগান এবং জাতীয় উদ্যান পেরিয়ে যেই তামাবিলের রোডে উঠতে যাবো অমনি চোখে পড়লো এক গ্রাম্য হাটের। স্থানীয় নিম্ন আয়ের মানুষজনের ভরপুর এই হাট। বেশ অনেক কিছুর সমাহার ঘটেছে এই হাটে। সিএনজি থামিয়ে হাটের ভেতর ঢুকে পড়লাম। হাট থেকে বের হয়ে আসার আগে ফর্মালিন মুক্ত তরমুজ দেখে লোভ সামলাতে না পেরে কিনে নিয়েই সিএনজিতে উঠে পড়লাম। আবার সিএনজি ছুটছে তামাবিলের রোডে। দূরে সীমান্তঘেষা ভারতে পাহাড় আর এই পারে আমাদের এই অপরূপ সৌন্দর্য্যের দেশ বাংলাদেশ। একটি সীমানা কতটা বদলে দিতে পারে তাই না? বদলে দিতে পারে ভাষা, চাল চলন, আচার অনুষ্ঠান, ধর্মীয় বিধি নিষেধ এমনকি মানুষের বিবেকবোধ। ভাবতে ভাবতে বেশ কিছুটা সময়ের মধ্যেই পৌছে গেলাম সারিঘাট-এ। এই ঘাট থেকেই নাকি ইঞ্জিন নৌকায় করে লালাখাল ঘুরে আসা যায়। তখন প্রায় বেলা ৩টা। ইতোমধ্যে ক্ষুদার প্রতিধবনি পেটের ভেতর হা হা কার করছে। তাই দেরি না করে সারিঘাটের স্থানীয় এক হোটেলে দুপুরের খাবার সেড়ে নিলাম।

একটি গ্রাম্য হাট
একটি গ্রাম্য হাট

খাওয়া দাওয়া করে নৌকা ঠিক করতে লাগলাম। কিন্তু এখানেই বিপত্তি। ড্রাইভারের এক দাম দুই হাজার। এর নিচে যাবেই না। আমি বললাম ১২০০, উনি বললো তাইলে ১৮০০। তারপর, আমি বললাম ১৩০০ দিবো, উনি বললো ১৭০০। এইভাবে করতে করতে ১৫০০ তে গিয়ে ঠেকলো। ১৫০০ টাকা চুক্তিতে ইঞ্জিন নৌকা ঠিক করলাম লালাখাল ঘুরে বেড়াবো। নৌকা ছাড়লো, ঘোলা পানির অংশটুকু পেরিয়ে যেই নীলাভ পানিতে প্রবেশ করছি আর ততই চারপাশের প্রাক্রিতিক সৌন্দর্য্যে মুগ্ধ হচ্ছি। দূরে দেখা যাচ্ছে ভারতের মেঘালয় রাজ্যের পাহাড়ের সারি। ঐসব পাহাড়ের উপর নাকি আধুনিক সভ্যতা রয়েছে। রয়েছে বিনোদন কেন্দ্র, স্কুল, হাসপাতাল এবং নাগরিক সকল সুবিধা। একেই হয়তো বলে আধুনিকতা। আর ঐ আধুনিকতার এপারের নিচের অংশটুকুই আমাদের সীমানা। যা লালাখাল জিরো পয়েন্ট নামে বিবেচিত।

লালাখালের নীলাভ জল
লালাখালের নীলাভ জল

প্রায় এক ঘন্টার বিশাল জার্নি শেষে আমরা লালাখাল জিরো পয়েন্টে পৌছাই। তবে ট্রলারের চালকের বক্তব্য একদম জিরো পয়েন্ট পর্যন্ত নাকি যাওয়া যায় না। বিজিবি নাকি যেতে দেয় না। এর সত্যতা কতটুকু আমি জানি না।

লালাখালের ছোট্ট এক বালুর চরে ট্রলার থামিয়ে আমরা গোসল সেড়ে নেই। আসার পথে শুনেছিলাম, লালাখালের সেখানে নাকি ঝর্না আর চা বাগান আছে। তাই ঝর্নার খোজে স্থানীয় একটা গ্রামে আমরা নেমে ঝর্না অভিযান শুরু করি। পুরো গ্রামটাই যেনো একটা চা বাগান, তবে মজার ব্যাপার হলো এই গ্রামের কোনো নাম নেই। সবাই লালাখাল ৩ং নামেই ডাকে। গ্রামে নেমে স্থানীয়দের ভাষ্যমতে জানতে পারি এই গ্রামে ঝর্না আছে, তবে সেটা অনেক দূর। সময় সাপেক্ষ যেতে। তাই আশেপাশে ছোট ঝর্নার খোজ করি। সেই সুবাদে পরিচয় হয় ভুবন নামের এক গ্রাম্য রোমিও এর সাথে। সে আমাদের আশ্বস্ত করে আমাদের ছোট ঝর্না হলেও সে দেখাবে। তাই আর তাকে নিয়ে ঝর্না অভিযান চালাই। প্রায় ৪০-৫০ মিনিট হাটার পর আমরা ছোট আকারের বেশ কিছু ঝর্না দেখতে পাই। যদিও কয়েকটায় পানি একদমই ছিলো না আর একটায় অল্প পানি ছিলো। কিন্তু আমরা তাতেই খুশী। কথায় আছে না, নাই মামার চেয়ে কানা মামা ভালো। সেই সময় আমরাও এই প্রবাদ বাক্যে বিশ্বাস স্থাপন করেছিলাম।

নামহীন গ্রামে আমরা
নামহীন গ্রামে আমরা

লালাখাল ৩ং গ্রামটা যেনো ছবির মতই সুন্দর। ছিমছাম গোছানো একটা গ্রাম। আবার কখনো সুযোগ এলে সেই গ্রামে গিয়ে বড় ঝর্না দেখে আসবোই। তাছাড়া ঐ ভুবন রোমিও আমাদের আশ্বাস দিয়েছে, এরপর আসলে সে নিজেই আমাদের নিয়ে বিশাল ঝর্না অভিযানে বেরুতে প্রস্তুত। ক্লাস সেভেনে পরা এই ছোট্ট রোমিও ভুবনকে বিদায় জানিয়ে আমরা নৌকায় উঠে পড়ি। পড়ন্ত বিকেলে লালাখালের নীলাভ পানি যেনো এবার গাড় নীল রূপ ধারন করলো।

ও হ্যা, লালাখাল জিরো পয়েন্টের দিকে যাওয়ার সময় একটা রিসোর্ট চোখে পড়েছিলো। ইচ্ছে ছিলো আসার সময় অন্তত একটু ঢুঁ মেরে আসি। ছাত্র জীবনে তো আর বিলাস বহুল রিসোর্টে রাত কাটানো সম্ভব নয়, তার চেয়ে বরং দুই একটা সেলফি হলে মন্দ হতো না। দুধের স্বাদ ঘোলে মেটানোর মত। কিন্তু ঈশ্বর বোধহয় সেদিন আমাদের সহায় হোন নি, ফেরার পথে রিসোর্টের কাছে আসতে আসতে ছয়টা বেজে যায় আর অন্যদিকে সাধারন জনগনের জন্য রিসোর্ট খোলা থাকে বিকেল সাড়ে পাচটা পর্যন্ত। তাই রিসোর্ট দেখার আশা লালাখালের নীলাভ জলে ফেলে দিয়ে সারিঘাটের উদ্দেশ্যে রওনা হই। সারিঘাটে পৌছাতে পৌছাতে প্রায় সন্ধ্যা সাতটা।

ট্রলার চালকের হাতে ১৬০০ টাকা গুজে দিয়ে রওনা হলাম সিলেটের উদ্দেশ্যে। পথিমধ্যে, রেড কন্ঠ চা কেবিন চোখে পড়লো। এখানে নাকি সাত লেয়ারের চা পাওয়া যায়। চতুর্থবারের মত সিলেট আসার পরেও সাত লেয়ারের চা আমার এর আগে খাওয়া হয়নি, তাই এবার সেটা মিস করলাম না। প্রতি কাপ ৭০ টাকা দিয়ে কি যে অখাদ্য পান করলাম তা বলে বুঝাতে পারবো না।

অখাদ্য সাত রঙা চা
অখাদ্য সাত রঙা চা

আম্বরখানা পৌছাতে পৌছাতে রাত সাড়ে আটটা। বাসার জন্য হালকা কিছু কেনাকাটা, খুব বেশী কিছু না, সবাই মিলে ৩-৪ ডজন শ্রীমঙ্গলের পিচ্চি আনারস, ৩-৪ টা সাতকড়া আচারের বোতল আর চা-পাতা কিনে চলে গেলাম সিলেটের আরেক বিখ্যাত রেস্ট্রুরেন্ট পানসিতে। গিয়ে দেখি এক এলাহী কান্ড। বেশ কিছু দাঁড়িয়ে থাকার পর সিট পেলাম বসার। বেশ ভালো মত উদরপূর্তি ঘটিয়ে চলে এলাম মাজার গেট। ততক্ষনে রাত বারোটা বেজে গেছে। বেশ কিছুটা সময় শাহজালাল (রঃ) এর মাজারে বসে থেকে রাত পৌনে একটায় কাউন্টারে চলে এলাম। ছোট্ট লেগুনা সার্ভিসে করে সোজা কদমতলী বাস স্ট্যান্ড। সেখান থেকে রাতের শেষ বাসে করে ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা। 🙂

ভ্রমণ বরাবরই মতই আমার কাছে একটি সুন্দর স্মৃতি হিসেবে সমাদৃত। তবে আমাদের মস্তিষ্ক খুব ভালো আর খুব খারাপ স্মৃতিগুলো খুব ভালো করে সংরক্ষণ করে রাখলেও, অতি সাধারন স্মৃতিগুলো ভালো ভাবে সংরক্ষণ করতে পারে না। তাই অতি ক্ষুদ্র ভালো স্মৃতিগুলো যেনো মস্তিষ্ক থেকে হারিয়ে গেলেও যেনো ভার্চুয়াল সময় সীমানায় টুকে রেখে মাঝে মাঝে তার স্মৃতি চারন করা যায়, তাহলে ব্যাপারটা খুব একটা মন্দ হয় না। তাই তো এই ক্ষুদ্র প্রচেষ্টা।

আমরা সবাই নামহীন গ্রামে
আমরা সবাই নামহীন গ্রামে

ছবি কৃতজ্ঞতাঃ সাহিদ এবং জাহিদ