প্ল্যান ছিলো লাস্ট সেমিস্টার ব্রেকেই নাফাখুম, আমিয়াখুম ঘুরে আসবো। কিন্তু বিধিবাম, এমনিতেই তো বর্ষাকাল তার উপর বেশ কয়েকটা পাহাড় ধ্বসের ঘটনা ঘটেছে আর সাঙ্গু নদীর পানিটাও নাকি বেড়েছিলো তাই এসব চিন্তা করে প্ল্যান পরিবর্তন করে গেলাম সিলেটে

তবে এই শরতের সেমিস্টার ব্রেকে নাফাখুম যেতেই হবে। শীতকালে গেলে সৌন্দর্য্যের অনেকটাই ভালো মত দেখা হবে না। আর মৃদু বর্ষার এই শরতে এক্সট্রিম ভয়ংকর রূপ না দেখা গেলেও মডারেট ভয়ংকর রূপ তো দেখা যাবেই। তাই প্ল্যান করলাম এবারের সেমিস্টার ব্রেকেই নাফাখুম, আমিয়াখুম ঘুরে আসবো।

তবে সেই বর্ষার বৃষ্টি যেনো পিছুই ছাড়ছে না। প্ল্যানের ঠিক আগের দিনও বৃষ্টি হয়েছে। এই বুঝি আর যাওয়া হচ্ছে না করে করেও সবকিছু ঠিকঠাক করে ফেললাম। তাই এনএসইউ এডভেঞ্চার ক্লাব (আনঅফিশিয়াল) এর উদ্যোগে আমরা ১২ জন ভ্রমণ পিপাসু মানুষ ১৩ই সেপ্টেম্বর রাতে রওনা হলাম বান্দরবানের উদ্দেশ্যে।

রাস্তায় বেশ জ্যাম হওয়ায় বান্দরবান পৌছাতে পৌছাতে আমাদের প্রায় সকাল সাড়ে সাতটা বেজে গেলো। এর আগেও এই শহরে আমার আসা হয়েছে, কিন্তু সেই আসাটা একটু ভিন্নরকম। সেই আসারও একটা গল্প রয়েছে। সময় হলে এইখানে ঢু মেরে নিলেই হবে। সময় বাঁচাতে সকালের নাস্তা হিসেবে রুটি কলা নিয়ে চান্দের গাড়িতে উঠে পড়লাম। থানচি যাবার পথেই হবে ব্রেকফাস্ট। আর কি লাগে।

দূরের মেঘ আর সবুজের হাতছানি
দূরের মেঘ আর সবুজের হাতছানি

পাহাড়ের আঁকাবাঁকা পথ পেরিয়ে যাচ্ছে চান্দের গাড়ি ছুটে চলছে। প্রতি বাকেই হর্নের প্রবল শব্দ। আর সামান্য দূরের সাদা মেঘগুলো যেনো বন্ধু ভেবে আমাদের সাথেই ছুটে চলছে।

ছোট বেলায় একটা ইচ্ছে ছিলো খুব, মেঘের উপর উঠার। জানিনা কেনো এমন ইচ্ছে ছিলো। বান্দরবানে গিয়ে আমি মেঘের উপরে উঠতে পেরেছি। মেঘের উপর থেকে আমি মেঘকে দেখতে পেরেছি। হারাতে পেরেছি মেঘের রাজ্যে, মেঘ বেধ করে যেতে পেরেছি অপর মেঘের আড়ালে।

ঠিক এই মূহুর্তে ছেলেবেলায় ফিরে গেলে আমি হয়তো দাঁত খিলখিলিয়ে চিৎকার দিয়ে উঠতাম। কিন্তু মনের গভীরতা এতটাই বেড়ে গিয়েছে, সেই অধিক খুশীর চিৎকার আজ ঠোটের কোনার মুচকি হাসিতে আটকে গেছে।

বলিপাড়া চেক পোস্টে এসে নাস্তা শেষ করে নিলাম সবাই। তারপর আবার যাত্রা শুরু। কারো ঝিমানু আর স্তব্ধ নয়নে দিবা স্বপ্নলোকে হারানোই বলে দিচ্ছে, বারংবারের সবুজ আর সাদা মেঘের হাতছানির ইনফাইনাইট লুপে পড়ে প্রায় সবার মধ্যেই বোরনেস চলে এসেছে।

প্রায় দুই থেকে আড়াইঘন্টার পাহাড়ি পথের চান্দের গাড়ির জার্নি শেষে আমরা পৌছালাম থানচিতে। আগে থেকে বলে রাখা সিমিয়ন দাদাকে ফোন দিলাম। দেখা হলো উনার সাথে। বলে রাখা ভালো এই সিমিয়ন দাদা আমাদের এইবারের ট্যুরের গাইড। খুব অমায়িক একজন মানুষ। উনার সাথে কথা বলে, অফিস থেকে পারমিশন এবং থানা থেকে পুলিশ পাশ নিয়ে থানচি থেকে পদ্মমুখের উদ্দেশ্যে রওনা হতে হতে প্রায় একটা বেজে গেলো। প্রায় মিনিট চল্লিশেক পর আমরা পৌছালাম পদ্মমুখ। মূলত এখান থেকেই আমাদের থুইসাপাড়া যাওয়ার ট্রেকিং শুরু।

পদ্মমুখ যাওয়ার পথে
পদ্মমুখ যাওয়ার পথে

হাটছি আর হাটছি, কখনো ঝিড়ি পথে, কখনো ঝিড়ির পাশ ঘেষা ছোট্ট পাহাড়ি পাথুরে ঢালে, কখনো আবার খাড়া পাহাড়। পথ যেনো শেষই হচ্ছে না।

থুইসাপাড়া যাওয়ার পথে প্রথম যেই পাড়াটা পড়বে তার নাম হচ্ছে রুনাজন পাড়া। প্রায় ঘন্টা তিনেক হাটার পর রুজানন পাড়া আমাদের হাতছানি দিলো। মনের ভেতর যেনো প্রবল একটা ঠান্ডা এবং শান্তির পরশ বইয়ে গেলো। কিন্তু এই পাড়ায় বিশ্রামের কোনো সুযোগ নেই আমাদের। কেননা আমাদের তো যেতে হবে থুইসাপাড়া।

ঘড়ি এবং আমাদের হাটার গতি দেখে অনুমান করা যাচ্ছে, থুইসাপাড়া যেতে যেতে আমাদের রাত হয়ে যাবে। তাই খুব বেশী যেনো রাত না হয় তাই আর রুজানন পাড়ায় সময় নষ্ট না করে হাটা শুরু। ঘন্টাখানেক হাটার পর আমরা পৌছালাম হরিচন্দ্রপাড়ায়।

হরিচন্দ্রপাড়া যাওয়ার পথে
হরিচন্দ্রপাড়া যাওয়ার পথে

সময় গতি এক না থাকায় অনেকেই তাল মিলাতে পারছে না। ট্রেকিং –এ এই ব্যাপারগুলো অস্বাভাবিক কিছু নয়। সবার হরিচন্দ্রপাড়ায় আসতে আসতে প্রায় সূর্য অস্তের জানান দিয়ে দিলো। এই ধরনের পাহাড়ি আর ঝিরি পথে অন্ধকারে হাটাটা খুব একটা নিরাপদ নয়, যেকোনো সময় দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। তাই প্ল্যান করা হচ্ছিলো, আজ না হয় আমরা হরিচন্দ্রপাড়ায় থেকে যাবো। কিন্তু ভাগ্য সহায় ছিলো না। কেননা, এই পাড়ায় এই মৌসুমে কেউ নেই। সবাই জুম চাষের তাগিদে পাড়া ছেড়ে পাহাড়ের ঢালে ঘর বেধেছে। মাস খানেক সেখানেই থাকবে। তারপর ফসল নিয়ে ঘরে ফিরবে। তাই রাতে এই পাড়ায় খাবার পর্যন্ত জুটবে না। কি আর করার, এক প্রকার বাধ্য হয়ে এবং সবার অনুমতি সাপেক্ষে অন্ধকারের ভেতরই হাতে আলো নিয়ে থুইসাপাড়ার উদ্দেশ্যে রওনা। যে করেই হোক থুইসাপাড়া পৌছাতে হবেই।

হরিচন্দ্রপাড়া থেকে থুইসাপাড়া যাওয়ার পথে
হরিচন্দ্রপাড়া থেকে থুইসাপাড়া যাওয়ার পথে

পারতপক্ষে, আমরা কেউই ধারনা করিনি, সামনের পথটুকু এতটা কঠিন আর ভয়ংকর হবে। একে তো পাহাড়ি রাস্তা, উঠছি, নামছি, আর তার উপর দুপাশে ঘন জঙ্গল। অন্ধকার, জোঁকের উপদ্রবে দলের প্রায় সবাই মোটামুটি মানসিকভাবে কিছুটা বিধ্বস্ত হয়ে পড়েছে। যে যেভাবে পারছে সবাইকে সাপোর্ট দিয়ে যাচ্ছে। প্রায় ঘন্টাখানেক ট্রেকিং করার পর, আমরা ঝিড়ির সন্ধান পাই। সেখান থেকে পানি পান করে সবাই মিলে সিদ্ধান্ত নিলাম, সামনে জুমঘর পেলে সেখানেই রাত কাটাবো তারপর আবার পরদিন থুইসাপাড়ার উদ্দেশ্যে রওনা হবো।

ঝিড়িপথে কিছুদূর হাটার পর, স্থানীয় এক লোককে দেখে আশ্বস্ত হলাম যে সামান্য দূরেই জুমঘর রয়েছে। তাকে অনুরোধ করলাম, আমাদের সবাইকে আজ রাতের জন্য জুমঘরে থাকার ব্যবস্থা করে দিতে। সে রাজি হলেন। তাকে অনুসরন করে প্রায় মিনিট তিরিশেক হাটার পর, আমরা পাহাড়ে ঢালে দেখা পেলাম জুমঘরের।
সবাই মিলেই সিদ্ধান্ত নিলাম আজ রাতটা এখানেই কাটিয়ে দিবো। দরকার হলে না খেয়েই কাটিয়ে দিবো। তবু এই ভয়ংকর পথে আর এই ঘুটঘুটে অন্ধকারে এক পা-ও এগুচ্ছিনা।

কূপীর আলোয় জুমঘরে রাতের খাবার আয়োজন
কূপীর আলোয় জুমঘরে রাতের খাবার আয়োজন

না খেয়ে জুমঘরে রাত কাটানোর সিদ্ধান্তটাই বোধহয়, আমাদের সেদিনের সবচেয়ে বড় ভুরিভোজের ব্যবস্থা করে দিয়েছে। জুমঘরের বাসিন্দারা আমাদের জন্য মুরগী রান্না করেছে, তাদের গাছের মিষ্টি কুমড়া রান্না করেছে আর সাথে ছিলো কলা আর ভুট্টা পোড়া। আর কি চাই। এই যেনো মেঘ না চাইতেই বৃষ্টি।
খাওয়া-দাওয়া পর্ব শেষে সবাই ঘুমানোর জন্য প্রস্তুত। জুমঘরের মাচাং-এ খোলা আকাশের নিচে ঘুমানো। এর থেকে বড় প্রাপ্তি কি হতে পারে? যেখানে বেশ কিছুটা সময় আগেও আমাদের মনের মাঝে ছিলো ভয় আর অনিশ্চয়তার হাতছানি।

দ্বিতীয় পর্ব এখানে…