কারো কাছে ভ্রমণ মানে আনন্দ, কারো কাছে নিছক প্রকৃতিতে মিশে যাওয়া আবার কারো কাছে ভ্রমণ মানে আত্ম উপলব্ধি আর আমার কাছে ভ্রমণ মানে… সেটা না হয় নাই বললাম, নিজের মধ্যেই থাকুক। প্রতিবারের সেমিস্টার ব্রেকের মধ্যে নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি এডভেঞ্চার ক্লাবের উদ্যোগে আমাদের এবারের গন্তব্য ছিলো নিঝুম দ্বীপ। সেই সাথে মনপুরা হয়ে চরকুকরি মুকরি। বোনাস হিসেবে যোগ করে নিয়েছিলাম রাঙ্গাবালিকে। কিন্তু পুরো প্ল্যানেই গুড়েবালি। আসলে ঠিক গুড়েবালি বললে ভুল হবে। কেননা কখনো কখনো ভ্রমণ অনেক বেশী কিছু দিয়ে ভাগ্য অনুকূলে থাকে আবার কখনো প্রতিকূলে। তাই বলে ভ্রমণ তো ভেস্তে যাবে না। সবই হবে তবে একটু ভিন্ন আঙ্গিকে যা আমাদের এবারের ট্যুরে হয়েছে।

দিন শূন্য (১লা জানুয়ারি, ২০১৮ইং)
নতুন বছরের প্রথম দিনেই ঢাকার বাইরে বেড়াতে যাওয়া। সংখ্যায় আমরা ১৪ জন। ঢাকা থেকে হাতিয়া রুটের সবচেয়ে ভালো মানের লঞ্চেই আমাদের যাত্রা। তাসরিফ এক। নদীপথে দূরের পথে ভ্রমণ আনন্দদায়ক হলেও লঞ্চের কেবিন বুক করতে গিয়ে অনেক রূঢ় বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হয়েছে। সেই বাস্তবতার গল্প না হয় অভিজ্ঞতার ঝুলিতে রেখে দিলাম।

নদীপথে এর আগে আমার ভ্রমণের অভিজ্ঞতা থাকলেও অনেকের কাছে তা নতুন। যার কারনে টিমের অন্যান্য সদস্যরা বেশ উৎসাহী। যথারিতী সন্ধ্যা ছয় ঘটিকার সময় বিশাল এক হুইসেল দিয়ে তাসরিফ এক –এ করে আমাদের ঢাকার সদরঘাট থেকে হাতিয়ার তমুরুদ্দি ঘাটের উদ্দেশ্যে রওনা হলাম।

বেশ খানিকটা সময় সবাই মিলে লঞ্চের কেবিনে আড্ডা দিলেও রাতের খাবারের পর সবার মধ্যে কিছুটা হলেও ঝিমুনি শুরু হয়ে যায়। ঝিমুনি আসাটাই স্বাভাবিক, বরং না আসলে আমার আর রাদের মত সারারাত লঞ্চের বারান্দাসম জায়গায় বসে কাটিয়ে দিতে হতো।

লঞ্চের বারান্দা থেকে দূরে আলো আধারের শিল্প বিপ্লব
ছবি কৃতজ্ঞতাঃ সোয়েব ভাই

প্রায় ১৪-১৫ ঘন্টা জার্নি শেষে আমরা সকাল সাড়ে আট ঘটিকায় হাতিয়ার তমুরুদ্দি ঘাটে পৌছালাম। আমাদের ১৪ জন মানুষের জন্য আমরা তিনটা ডাবল কেবিন নিয়েছিলাম, কেবিনের ভাড়া চুকিয়ে লঞ্চ থেকে হাতিয়ার ঘাটে নামলাম। বলা বাহুল্য যে, ঢাকা থেকে নিঝুম দ্বীপ আসার সবচেয়ে সহজ রাস্তা নদীপথ এবং এই হাতিয়া হয়েই।

হাতিয়ার তমরুদ্দিন লঞ্চঘাট
ছবি কৃতজ্ঞতাঃ সোয়েব ভাই

দিন এক (২রা জানুয়ারি, ২০১৮ইং)
হাতিয়ার তমুরুদ্দি বাজারে সকালের নাস্তা সেড়ে এইবারের উদ্দেশ্য নিঝুম দ্বীপের নামার বাজার ঘাটে। সাধারনত দুই উপায়ে নিঝুম দ্বীপের নামার বাজার যাওয়া যাবে। প্রথমটা হচ্ছে, সড়ক পথে পুরো হাতিয়ার এই তমুরুদ্দি থেকে শেষ প্রান্ত পর্যন্ত গিয়ে নৌকায় করে নদী পার হয়ে বন্দরটিলা, সেখান থেকে আবার সড়ক পথে নিঝুম দ্বীপ। অন্যটি হলো সরাসরি হাতিয়ার তমুরুদ্দি থেকে ট্রলারে করে নামার বাজার। সড়ক পথে যদিও খরচ কিছুটা কম তবে এতজন মানুষ নিয়ে সড়ক পথে মুভ করাটা একটু সময় সাপেক্ষ। তাই আমরা আবারো নদীপথ বেছে নিলাম। এইবারের সঙ্গী আর বিশাল কোনো লঞ্চ নয়, মাঝারি আকারের ট্রলার। প্রায় তিনঘন্টা নদীপথের যাত্রা শেষে আমরা নামার বাজার ঘাটে পৌছালাম।

হাতিয়া থেকে নিঝুম দ্বীপ যাওয়ার পথে এরকম অসংখ্য গ্রাম্য সংগ্রামী জীবন চোখে পড়বে। যাদের কাছে জীবন যুদ্ধ মানে তিনবেলা ভাত আর রাত্রিরে মাথা গুজাবার ঠাই।
এক নজরে নিঝুম দ্বীপঃ বঙ্গোপসাগরের কোলে উত্তর ও পশ্চিমে মেঘনার শাখা নদী, আর দক্ষিণ এবং পূর্বে সৈকত ও সমুদ্র বালুচরবেষ্টিত ছোট্ট সবুজ ভূখণ্ড নিঝুম দ্বীপ। অগণিত শ্বাসমূলে ভরা কেওড়া বাগানের এক সবুজ এই দ্বীপকে। দিনে দুবার জোয়ার-ভাটার এই দ্বীপের এক পাশ ঢেকে আছে সাদা বালুতে, আর অন্য পাশে সৈকত। এখানে শীতকালে বসে হাজার পাখির মেলা, বন্য কুকুর আর সাপের অভয়ারণ্য এই বনের সবুজ ঘাস চিরে সারা দিন দৌড়ে বেড়ায় চিত্রা হরিণের দল। এই হলো নিঝুম দ্বীপ। নিঝুম দ্বীপের সবচেয়ে আকর্ষণীয় বিষয় হলো মাইলের পর মাইল জুড়ে কেওড়া বন আর সেই বনের পাতার আড়ালে লুকিয়ে থাকা চিত্রা হরিণ।এখানে সমুদ্রের বুকে হেলে পড়ে অস্তগামী সূর্য, হাজার পাখির কলতান নিস্তব্দতার ঘুম ভাঙ্গায়, মায়াবী হরিনের পদচারনায় মুখরিত হয় জনপদ, সারি সারি কেওড়া গাছের কোল ঘেষে বয়ে চলে নদী, চুপিসারে কাছে ডাকে, মায়াবী ইন্দ্রজানে বেধে ফেলে মনুষ্যপ্রজাতীকে। সমুদ্রকোল হতে সরু খাল সবুজের বুক চিরে চলে গেছে গহীন বনে। সে যে সবুজ আর নোনা জলের কি এক প্রেমকাব্য না দেখলে বিশ্বাস করা যায় না। যেন সবুজ গালিচা বিছিয়ে দেয়া হয়েছে সমুদ্রের তলানী পর্যন্ত। স্বচ্ছ পানির নিচে সবুজ ঘাষ আর মাছেরা খেলা করে আপন খেয়ালে। দেখলেই মন চাইবে ঝাপিয়ে পড়ে পরাণ জুড়াই। এ এমনই এক মায়াবী প্রকৃতি যা শহুরে কর্মচঞ্চল মানুষক নতুন এক জীবন দেয়। নিঝুম দ্বীপ- সত্যিই নিঝুম। একবারই অলাদা। সব কিছুর বাহিরে। এখানে নেই পর্যটনের চাকচিক্য, রং বেরং এর বাতির ঝলক কিংবা যান্ত্রিক কোন বাহনের বিকট শব্দ। নিঝুম- সত্যিই নিঝুম, নিশ্চুপ। এ যেন প্রকৃতির একটি আলাদা সত্ত্বা। যা আর কোথাও নেই।

তথ্য সংগৃহীতঃ https://goo.gl/4cGa9Q

ছবি কৃতজ্ঞতাঃ আজিজ ভাই

নামার বাজার নামলেই বেশ কয়েকটি রিসোর্ট আর হোটেলের দেখা মিলবে, এরমধ্যে হোটেল শাহীন, হোটেল সোহেল আর নিঝুম রিসোর্ট (হোটেল অবকাশ) অন্যতম। তবে ঢাকা থেকে নিঝুম রিসোর্ট সম্পর্কে এতই ভালো রিভিউ পেয়েছি তাই আসার আগে নিঝুম রিসোর্টই বুক করে আসি। উনাদের বিশাল এক ডর্মিটরি রুম আছে। যদিও ১২টা বেড তবে ১৪-১৫ অনায়াসে ঘুমানো যাবে। তবে ভাড়াটা একটু বেশী মনে হয়েছে। খুব সম্ভব ঢাকা থেকে অগ্রীম বুক করার ফলেই ভাড়াটা বেশী রাখা হয়েছে। তবে এই ভাড়াটা কিছুই মনে হবে না, যখন নিঝুম রিসোর্টের ম্যানেজার সবুজ ভাইয়ের সাথে পরিচয় হবে। খুবই আন্তরিক মানুষ।

নিঝুম রিসোর্ট
ছবি কৃতজ্ঞতাঃ সোয়েব ভাই

নিঝুম দ্বীপে হোটেলে চেক-ইন দিতে দিতে প্রায় দুপুর। ততক্ষনে সকলের পেট ক্ষুধা নিবারনের আহ্বান জানাচ্ছে। তাই আর দেরী না করে চলে গেলাম আলতাফ চাচার হোটেলে। খুব সম্ভব নিঝুম রিসোর্টের সাথে উনার কিছুটা যোগসূত্র রয়েছে। কেননা নিঝুম রিসোর্টে যে কাউকেই যদি জিজ্ঞাসা করেন কোথায় খাবো তাহলে আলতাফ চাচার হোটেলের কথাই বলবে। তাছাড়া আলতাফ চাচাকেও বেশ ভালো মানুষ মনে হয়েছে। আর খাবারের দামও খুব একটা বেশী রাখেনি। আমরা যতদিন নিঝুম দ্বীপে ছিলাম ততদিনই উনার হোটেলেই আমরা নাস্তা, দুপুরের খাবার এবং রাতের খাবার খেয়েছি।

আলতাফ চাচার হোটেলে দুপুরে খেয়ে আমরা বেড়িয়ে পড়লাম সমুদ্র সৈকত দেখতে। খুব শান্ত, নিরিবিলি আর কোলাহল মুক্ত সমুদ্র সৈকত শেষ কুতুবদিয়ায় দেখেছি। যদিও কুতুবদিয়ার সমুদ্র সৈকতে পা ভেজানো গিয়েছিলো তবে নিঝুম দ্বীপে সমুদ্র সৈকতে পা ভেজানো সৌভাগ্য হয়নি। কেননা সমুদ্র নামতে হলে বেশ খানিকটা কাদা পাড়াতে হবে যেটার ইচ্ছেটা জাগেনি।

নামার বাজার থেকে সমুদ্র সৈকত খুব একটা দূরে নয়। মিনিট দশেক লাগবে হেঁটে যেতে। শুভ্র বালি, এলোমেলো বাতাস, আর বিচ্ছিন্ন খেজুর গাছগুলো পুরো সমুদ্র সৈকতটাকে একটা অলৌকিক আবহ দিয়েছে। যতটাই হাটবেন শুধু হাটতেই ইচ্ছে করবে। এই বিশালতার যেনো শেষ নেই। এই যেনো শুভ্র গহ্বরে হারায়ে যাওয়া।

নিঝুম দ্বীপ সমুদ্র সৈকত
ছবি কৃতজ্ঞতাঃ সোয়েব ভাই

সেদিনের মত শুধু সমুদ্র সৈকতটাই দেখা হয়েছে। তারপর সন্ধ্যা নামার খানিকটাবাদে হোটেলে ফিরে আসা। নিজেদের মধ্যে আড্ডা আর হইহুল্লোড় আর এর মাঝেই খেজুরের রস পান। নিঝুম দ্বীপের অসাধারন প্রকৃতি ছাড়া কোনো বিশেষত্ব ধরা দেয়নি, তবে এই শীতকালে গেলে হয়তো খেজুরের রসের হাড়িতে মন আটকে যাবে। আহ, অমৃত।

পরবর্তী পর্বের [দ্বিতীয়] জন্য এখানে ক্লিক করুন

এই ট্যুরের ছবির এ্যালবামের লিংক এখানে