সকাল সাড়ে নয়টার দিকে ঘুম ভাংলো। ঘুম থেকে উঠে ফ্রেশ হতে না হতেই রঞ্জুর ফোন। আমার পশ্চিমবঙ্গের বন্ধু। ওর কথা লিখতে গেলে নতুন একটা ব্লগপোস্ট করতে হবে। তাই তেমন কিছু লিখছি না এখানে। ও নদীয়া থেকে আসছে কলকাতায় আমার সাথে দেখা করার জন্য। এখন ট্রেনে। আমাদের দেখা হবে কলেজ স্ট্রীটে। তাই আমিও রেডি হয়ে উবার নিয়ে সোজা চলে গেলাম কলেজ স্ট্রীট। আজ শুক্রবার। কলকাতায় আমার শেষ দিন। তাই এই দিনটায় চুড়ান্তরকমের ঘুরাঘুরি করতে চাই। ঢাকার শুক্রবার আর কলকাতার শুক্রবারের মধ্যে অনেক পার্থক্য। কেননা ঢাকায় শুক্রবার হচ্ছে সাপ্তাহিক ছুটি অন্যদিকে কলকাতায় সাপ্তাহিক ছুটি মূলত রবিবার। সে যাই হোক। মৃদু বৃষ্টি আর মেঘলা আবহাওয়ার কারনে দিনটা বেশ ভালো লাগছে। কোনো রকম অসহ্য গরম নেই।

কলেজ স্ট্রীট, কলকাতা
কলেজ স্ট্রীট, কলকাতা

কলকাতার কলেজ স্ট্রীটকে মূলত বলা হয় বই পাড়া। অনেকটা আমাদের নীলক্ষেতের মত। কলেজ স্ট্রীটে ঢুকলেই প্রথমে নীলক্ষেতের কথা মনে পড়তে বাধ্য। মিনিট বিশ পচিশের মাথায় উবার করে আমি চলে এলাম কলেজ স্ট্রীটের প্রেসিডেন্সি ইউনিভার্সিটির প্রধান ফটকে। এর আশেপাশেই বোধহয় কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে। তাই দেখছিলাম গুগল ম্যাপে। বেশ কিছুক্ষন দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছি। ততক্ষনে সকাল সাড়ে দশটা। এখনো দোকানপাট তেমন একটা খুলেনি। যদিও আজ সাপ্তাহিক ছুটি নয় তবে আজ ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারি ছুটি। মুহররমের ছুটি মূলত। তাই এদিকটায় ভীড় বেশ কম বা নাই বললেই হয়। পার্ক স্ট্রীট বা মারকুইস স্ট্রীটের ঐদিকটার কলকাতায় যেখানে হিন্দী ভাষাভাষী লোকের একটু আধিক্য ঠিক এদিকটায় বাংলা ভাষাভাষী লোকজন বেশী। প্রায় সবাই বাংলায় কথা বলছে। আশেপাশে নানান ব্যাপার উপভোগ করার কিছুক্ষনের মাথায় রঞ্জু চলে এলো। দুজন মিলে চলে গেলাম সোজা কফি হাউজে। মান্না দে-এর সেই বিখ্যাত দি ইন্ডিয়ান কফি হাউজ। যেই কফি হাউজ নিয়ে মান্না দে বিখ্যাত কফি হাউজের আড্ডাটা আজ আর নেই গানটা গেয়েছিলেন সেটাই এই কফি হাউজ। কেমন যেনো একটা ছিমছাম আর আবেগপূর্ন একটা পরিবেশ। এখানে বসার পর থেকেই অন্যরকম একটা অনুভূতি কাজ করছিলো। আর আমিও সেই অনুভূতিটা বুঝতে পারছিলাম।

বেশ খানিকটা সময় বসে থাকার পর একজন বেয়ারা অলস ভঙ্গিমায় এসে অর্ডার নিয়ে গেলো। মনে হলো বহু দিনের পুরোনো এই এক ঘেয়েমি কাজ করতে করতে খুব বেশী ক্লান্ত সে। তার ক্লান্ত চাহনী আর ভঙ্গিমায় খুব বেশী মনোযোগ না দিয়ে ঝটপট অর্ডার করে দিলাম। পনের-বিশ মিনিটের মাথায় চলে এলো আমাদের নাস্তা। ফিশ কাটলেট আর কফি হিসেবে সকালের নাস্তাটা সেড়ে নিলাম। খুব সুন্দর একটা জায়গা। আবারো কখনো কলকাতায় আসা হলে এই জায়গায় আসবো। অবশ্যই আসবো। জায়গাটার সৌন্দর্য্য মূলত এর অবকাঠামো আর পুরাকালের অস্তিত্বে। ঘন্টার পর ঘন্টা কাটিয়ে দেয়া যাবে কোনো প্রকার তিক্ততা ছাড়াই। ঠিক এমনই একটি জায়গা এই কফি হাউজ।

জোড়াসাঁকো ঠাকুর বাড়ি
জোড়াসাঁকো ঠাকুর বাড়ি

কফি হাউজ থেকে নাস্তা সেড়ে হাটতে হাটতে চলে এলাম জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়ি। এটি ঠাকুর পরিবারের প্রাচীন বাড়ি। মূলত এই বাড়িতেই বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর জন্মগ্রহন করেন। তবে বর্তমানে এটি রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের জোড়াসাঁকো শিক্ষাপ্রাঙ্গন হিসেবে পরিচিত। সরকারি ছুটি থাকায় ভেতরে ঢুকার সুযোগ মেলেনি আমাদের। তাই বাইরে থেকে সৌন্দর্য্য খানিকটা অবলোকন করে হাটতে হাটতে চলে গেলাম কুমারটুলিতে। মূলত কথ্য ভাষায় একে কুমোরটুলি হিসেবে ডাকা হয়ে থাকে। এটি কলকাতার উত্তরভাবে অবস্থিত। কুমারটুলি মূলত প্রতিমা শিল্পের জন্য বিখ্যাত। শত বছর ধরে এখানে নানান পূজার প্রতিমা বানানো হয়। তাই এই অঞ্চলটি ‘পটুয়াপাড়া’ বা মৃৎশিল্পীদের বসতি অঞ্চল হিসেবে বেশ বিখ্যাত।

কুমারটলী, কলকাতা
কুমারটলী, কলকাতা

কুমারটুলি অঞ্চলের মৃৎশিল্পীদের দক্ষতার কথা সর্বজনবিদিত। কলকাতার এই অঞ্চল থেকে দেবদেবীর প্রতিমা কেবলমাত্র শহরের সর্বজনীন ও ঘরোয়া পূজার জন্যই সরবরাহ করা হয় না, অনেক ক্ষেত্রেই তা দেশের বাইরেও রপ্তানি করা হয়। সামনে দুর্গাপূজা তাই এই এলাকার ব্যস্ততা চোখে পড়ার মত। বেশ কিছুক্ষন কুমারটুলিতে কাটিয়ে উবার নিয়ে চলে গেলাম জৈন মন্দিরে। জৈন মন্দির হল জৈনধর্মের অনুগামীদের উপাসনালয়। ভারতের গুজরাত ও রাজস্থান রাজ্যে জৈন মন্দিরকে দেরাসর বলা হয়। জৈন মন্দিরকে বসডি নামেও অভিহিত করা হয়ে থাকে। এছাড়া জৈন মন্দির দর্শন করতে গেলে কয়েকটি নিয়ম পালন করতে হয়। খুব সম্ভবত তারা বুঝতে পেরেছিলো আমরা ঘুরতে এসেছি তাই মন্দিরে ঢুকতে দিতে চাচ্ছিলো না। তাই আর জোরপূর্বক ঢুকার চেষ্টাও করিনি। এই মন্দিরের বাইরে একটা ব্রীজ টাইপ রাস্তা আছে। সেখানে দাড়ালে পুরো মন্দিরটা বেশ ভালোভাবে দেখা যায়। তাই সেখান থেকে যতটুকু সম্ভব দেখার চেষ্টা করেছি। ভেতরটা বেশ সুন্দর এবং সত্যিকার অর্থেই প্রশংসার দাবীদার। আর তা না হয়েও উপায় নেই, কেননা জৈন মন্দিরগুলি বিভিন্ন প্রকার স্থাপত্যশৈলী অনুসারে নির্মিত হয়ে থাকে।

জৈন মন্দির, কলকাতা
জৈন মন্দির, কলকাতা

দুপুর সাড়ে বারোটা কি একটা বেজে চলেছে ঘড়িতে। তাই দুপুরের খাবারটা খেয়ে ফেলা উচিত। শুনতে খুব দ্রুতই মনে হচ্ছে। তবে এতগুলো রাস্তা ঘুরে বেড়াতে বেশ ভালোই ক্যালরি খরচ হয়েছে তাই খিদেটাও একটু দ্রুত লেগেছে। কলকাতায় ঐতিহ্যবাহী কিছু খাওয়া উচিত। যেহেতু উত্তর কলকাতায় পদচারণ হয়েছে। তাই সেখান থেকে চলে গেলাম ভজহরি মান্নাতে। এটি মূলত কলকাতার ঐতিহ্যবাহী খাবারের জন্য বিখ্যাত একটা রেস্তোরা। সেখানে গিয়ে পোলাও, ছানার তরকারি, মুরগি, মাছ এবং আফিম দিয়ে তৈরী এক ধরনের কোপ্তা, ডাব চিংড়ি দিয়ে দুপুরের খাবারটা সেড়ে নিলাম।

ভজহরি মান্না রেস্তোরাঁর খাবারের একাংশ
ভজহরি মান্না রেস্তোরাঁর খাবারের একাংশ

খাবার সেড়ে নিয়ে বাইরে বেড়িয়ে দেখি ঝুম বৃষ্টি হচ্ছে। কোনো রকমে একটা উবার কল দিয়ে সোজা চলে গেলাম মাদার’স ওয়াক্স মিউজিয়ামে। এটি মূলত কলকাতার নিউ টাউনে অবস্থিত একটি মোম শিল্পকর্মের জাদুঘর। ২০১৪ সালের নভেম্বর মাসে প্রতিষ্ঠিত এই জাদুঘরটিই ভারতের প্রথম মোমশিল্পের জাদুঘর। এটি মাদাম তুসো জাদুঘরের আদলে নির্মিত। বেশ দৃষ্টিনন্দিত একটা মিউজিয়াম। আর মিউজিয়ামটা যে এলাকায় সেটাও অনেক দৃষ্টিনন্দন এলাকা। যত দূর চোখ যাচ্ছিলো শুধু সুবিশাল রাস্তা আর অট্টালিকা চোখে পড়ছিলো। বিশ্বের অনেক বিখ্যাত মানুষদের প্রতিকৃতি মোম দিয়ে বানানো রয়েছে সেখানে। আমাদের জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমানের প্রতিকৃতিও আছে সেখানে। এছাড়া আলবার্ট আইনস্টাইন সহ আরো অনেক বিশ্ব বিখ্যাত বিজ্ঞানী ও খেলোয়ারের প্রতিকৃতি। এছাড়াও রয়েছে নানান ভৌতিক সিনেমা, কার্টুনসহ বিখ্যাত বেশ কিছু চরিত্রের প্রতিকৃতি।

মাদার ওয়াক্স মিউজিয়ামে মাইকেল জ্যাকসনের মোমের প্রতিকৃতি
মাদার ওয়াক্স মিউজিয়ামে মাইকেল জ্যাকসনের মোমের প্রতিকৃতি

সেখানে অনেকটা সময় কাটিয়ে চলে এলাম ঠিক তার উল্টোপাশের ইকো পার্কে। সুবিশাল ইকো পার্ক। এই ইকো পার্কে সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত কাটিয়ে দেয়া অসম্ভব কিছু নয়। অনেক জগতনন্দিত অট্টালিকার মিনি ক্রিয়েচার ভার্সন এই ইকো পার্কে রয়েছে। এছাড়াও অনেক সুন্দর সাজানো, গোছানো একটা পরিবেশ।

ইকো পার্ক, কলকাতা
ইকো পার্ক, কলকাতা
ইকো পার্ক, কলকাতা
ইকো পার্ক, কলকাতা

ইকো পার্কে বেশ কিছু সময় কাটিয়ে লোকাল বাসে করে চলে এলাম দমদম স্টেশনে। ততক্ষনে সন্ধ্যা সাড়ে ছয়টা বেজে গিয়েছে। সেখান থেকে মেট্রোতে করে চলে এলাম এসপ্ল্যানেড স্টেশনে। সেখান থেকে হেটেই নিউমার্কেট। বিশ মিনিটের মত লেগেছে দমদম থেকে নিউ মার্কেট আসতে। নিউ মার্কেট এসে বিগ বাজার থেকে হালকা শপিং করে রঞ্জুকে বিদায় দিয়ে আমি হোটেলে দিকে পা বাড়ালাম। গুগল ম্যাপে ডেস্টিনেশন সিলেক্ট করে হেটে হেটে এগুতে লাগলাম। মিনিট বিশেকের মধ্যেই হোটেলে চলে এলাম। কেননা মারকুইস স্ট্রীট নিউ মার্কেটের খুব কাছেই। হোটেলে এসে ফ্রেশ হয়ে রাতের ডিনার শেষে ব্যাগট্যাগ গুছিয়ে রাখলাম সব। কেননা কাল সকালেই বাসে করে ঢাকা ফিরবো। অজস্র স্মৃতি নিয়ে।