ঠিক কখন থেকে তা মনে করতে পারছি না, তবে বেশ আগ থেকেই লালন শাহ-এর গানগুলোর প্রতি একটা অন্যরকম অনুভূতি কাজ করতো। মনে হত এই গানগুলো আমার চিন্তাধারার কথা বলে। আমি যেই কথাগুলো কারো সাথে সঠিকভাবে প্রকাশ করতে পারছি না, ঠিক সেই কথাগুলো গানের মাধ্যমে সহজ ও সাবলিল ভাষায় সাইজি তার গানের মাঝে প্রকাশ করে গেছেন শতবছর আগেই। তাই বেশ বেশ কয়েকটা বছর ধরেই ইচ্ছে ছিলো লালন মেলায় গিয়ে বাউলের গলায় সাইজির গান শোনার। কিন্তু সময় সুযোগের অভাবে সেটা একদমই হচ্ছিলো না। তবে এই বছরের অক্টোবরে লালন শাহ-এর ১২৭তম তিরোধান উৎসবে যাওয়ার সৌভাগ্য হয়েছিলো। বলতে গেলে হুটহাট করেই যাওয়ার প্ল্যান। তাছাড়া পুজোর ছুটিও ছিলো, একদম ব্যাটে বলে মিলে যাওয়ার মতো। তাই এইবার প্ল্যানটাকে আর বাতিলের খাতায় না ফেলে ১৫ই অক্টোবর রাতের বাসে করে রওনা হই কুষ্টিয়ার উদ্দেশ্যে। আমরা আটজন এইবারের যাত্রায়।

ঢাকার কল্যাণপুর বাস স্ট্যান্ড থেকে রাত এগোরাটার বাসে করে কুষ্টিয়ার উদ্দেশ্যে আমাদের যাত্রা শুরু হয়। সিরাজগঞ্জে প্রায় আধ ঘন্টা বিরতি দিয়ে সকাল ছয়টার মধ্যেই আমরা কুষ্টিয়া শহরে পৌছে যাই। কেমন যেনো একটা স্নিগ্ধ সকাল। বুক বুকে নিঃশ্বাস নিতে কেমন যেনো একটা অদ্ভূত ভালোলাগা কাজ করছিলো। হয়তো ঢাকার তুলনায় বিশুদ্ধ বাতাস বলেই এই শুদ্ধ একটা অনুভূতির আলোরন কেটে দিচ্ছে ফুসফুসে। হালকা ঠান্ডা আবহাওয়ায় টঙ্গের দোকান হতে এককাপ গরম ধোয়া উড়া চা পান করে, এই সাত-সকালের লালন আখড়ার পরিবেশটা দেখতে খুব একটা দেরি না করে একটা অটো নিয়ে চলে যাই আখড়ায়। হাজারো লালন অনুসারী বাউলের সমাগম সেখানে। গতকাল থেকেই এরা আখড়ায় আছে। আগামী তিনদিন এখানেই থাকবে, খাবে, ঘুমাবে। আজকের রাতটা এদের সাথে থেকেই কাটিয়ে দেয়ার প্ল্যান আমাদের। বেশ কিছুটা সময় আখড়া ও তার আশপাশ ঘুরাঘুরি করে কুষ্টিয়া শহরের আশপাশটা ঘুরে দেখার জন্য বের হলাম। একটা অটো নিয়ে সোজা চলে গেলাম রবীন্দ্রনাথের কুঠিবাড়িতে। তখন সকাল সাড়ে আটটা বাজে। এখনো খুলেনি। সকাল নয়টায় খুলবে। তাই ঠিক তার পাশেই জেলা পরিদর্শকের অফিসের পুকুর পাড়ে বসে আছি সবাই মিলে। এর মাঝেই কচি ডাব, আর কুষ্টিয়ার বিখ্যাত কুলফি মালাই এর স্বাদ নেয়া হয়ে গেছে।

কুষ্টিয়ার বিখ্যাত কুলফি মালাই
কুষ্টিয়ার বিখ্যাত কুলফি মালাই। ছবিঃ সোয়েব ভাই

ব্যক্তিগতভাবে আমার কাছে এই কুলফি মালাই-এর কোনো বিশেষত্ব ধরা পড়েনি। সে যাই হোক। কিছুক্ষন বাদেই দর্শনার্থীদের জন্য খুলে দেয়া হলো রবীন্দ্রনাথের শিলাইদহ কুঠিবাড়ি। ভেতরটা বেশ সুন্দর। মাঝে মাঝে নিজেরও ইচ্ছে হয়, এমন একটা পরিবেশে যদি থাকা যেতো। চারদিকে শুনশান নিরবতা। কিছুটা সামনে এগুলেই ফুলের বাগান। তার অন্য পাশে শান বাধানো পুকুর ঘাট। আরো অনেক কিছুর সমারোহ। বেশ আর্টিস্টিক পরিবেশ। আর্টিস্টিক না হয়ে উপায় নেই, রবী ঠাকুর বলে কথা।

শিলাইদহ কুঠিবাড়ি। ছবিঃ রায়হান
শিলাইদহ কুঠিবাড়ি। ছবিঃ রায়হান

সেখানে বেশ অনেকটা সময় কাটিয়ে বারোটার দিকে চলে গেলাম পদ্মার পাড়ে। কুষ্টিয়া থেকে পদ্মার বিশালতা দেখা যায়। তবে দুপুরের কড়া রোদের কারনে পদ্মার পাড়ের সৌন্দর্য্যটা খুব একটা টানছে না। সকালের নাস্তা করা হয়নি কারোই তাই হালকা ভাজাপোড়া খেয়ে পদ্মার পাড় থেকে চলে গেলাম কুষ্টিয়া বাস স্ট্যান্ডে। সেখানে নেমে দুপুরের খাবার খেয়ে দুইটা সিএনজি রিজার্ভ নিয়ে সবাই মিলে চলে গেলাম শত বছরের অধিক পুরোনো হার্ডিঞ্জ ব্রীজে। ব্রিটিশ আমলে এই ব্রীজের যে অনেক বেশী গুরুত্ব ছিলো তা এ ব্রীজের নির্মাণ শৈলীতেই ধরা পড়ে। ব্রীজের আশপাশ এমনকি ব্রীজের উপরে উঠে বেশ ভিতর পর্যন্ত হেটে গিয়ে ব্রীজটাকে বেশ ভালো ভাবে দেখা হয়েছে আমাদের।

হার্ডিঞ্জ ব্রীজ। ছবিঃ রায়হান
হার্ডিঞ্জ ব্রীজ। ছবিঃ রায়হান

ঠিক সন্ধ্যা নামবে নামবে সময়, হার্ডিঞ্জ ব্রীজ থেকে স্রোতস্বিনী পদ্মা নদী আর ব্রীজের ওপারের জেলা ঈশ্বরদীকে বিদায় জানিয়ে আবারো কুষ্টিয়া শহরের উদ্দেশ্যে রওনা হলাম। বাস স্ট্যান্ডে নেমে সন্ধ্যার নাস্তা সেড়ে চলে গেলাম গ্রুপের পরিচিত একজনের বন্ধুর বাসায়। সেখানে ফ্রেশ হয়ে, গোসল করে, খানিকটা রেস্ট নিয়ে রাত দশটা নাগাদ চলে এলাম লালন শাহ আখড়াতে। ততক্ষনে দূর দুরান্তে থেকে আরো অনেক লালন অনুরাগী, দর্শনার্থীর সমাগম শুরু হয়েছে। তাছাড়া দুর্গা পূজার কারনেও সেখানে বেশ ভীড়। অনেকটা ভীড় ঠেলে চলে গেলাম মাজারের বিপরীত অংশে। সেখানে ততক্ষনে দেশের নানান প্রান্তের বাউলরা সাইজির গান পরিবেশন করছে। রাতভর বাউলের গান, কলাই-এর রুটি, মরিচ ভর্তা, সরষে পেয়াজ মাখা, ফুচকা, ছোলা, মিষ্টি নানান ধরনের খাবার খেয়ে, গান শুনে, আড্ডা দিয়ে আর আশপাশটা ঘুরে বেড়িয়ে রাত কাটাচ্ছি আমরা সবাই মিলে।

সাইজির মাজার। ছবিঃ সোয়েব ভাই
সাইজির মাজার। ছবিঃ সোয়েব ভাই

ভোরের আলো ফুটতে শুরু করছে, আর বাউলরা তাদের গান থামিয়েছে। এখন সবারই বাসার ফেরার পালা। মাজার এলাকা থেকে হালকা কেনাকাটা করে ভোর সাড়ে পাচটা নাগাদ চলে এলাম গতরাতের পরিচিত-এর বাসায়। সেখানে ঘন্টাখানেক বিশ্রাম নিয়ে, সকালের নাস্তা সেড়ে সকাল সাড়ে নয়টার বাসে করে ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা হলাম। আর সাথে নিয়ে ফিরলাম, সাইজির গানের খানিকটা রূঢ় রহস্য আর কতক জীবনদর্শন।

“মানুষ ভজলে সোনার মানুষ হবি”