সারাদিনের ঘুরাঘুরি, গতরাতের জার্নি সবকিছু মিলিয়ে রাতভর গল্পটা খুব রাত অবধি আগায়নি। এছাড়া পরের দিনের প্ল্যান অনুযায়ী আমাদের দামতুয়া ঝর্না দেখতে যাওয়ার কথা রয়েছে। তাই দ্রুতই রাতে ঘুমিয়ে পড়তে হয়েছে।

ঘুর্নিঝড় বুলবুলের কারনে সমুদ্র উপকূলবর্তী এলাকাতে সতকর্তা সংকেত জারি করা হয়েছে। আর এর প্রভাব সারাদেশেই কমবেশী পড়ছে। সারারাত ঝুম বৃষ্টির মধ্যে সকালে যখন ঝিরিঝিরি বৃষ্টিটা কমছে না, তখন হয়তো ভেবেছিলাম আমাদের দামতুয়া যাওয়া হবে না। কেননা পাহাড়ি পথে বৃষ্টির মধ্যে যাওয়াটা বেশ বিপদজনক। ঝিরি পথগুলোতে যেকোনো সময় ফ্ল্যাশ ফ্লাডের একটা আশংকা থাকে। নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি এডভেঞ্চার ক্লাব (আনঅফিশিয়াল)-এর প্রথম ট্যুরে মিরসরাই-এর একটা ট্রেইলে ফ্ল্যাশ ফ্লাডের সম্মুখীন হয়েছিলাম আমরা। সে এক রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা। যে যাই হোক, সবকিছু চিন্তা ভাবনা করে মনটাই খারাপ হয়ে গেলো এই ভেবে যে, আসল জিনিসই দেখা বাকি পরে থাকলো।

তবে কিছুসময়ের মধ্যেই ঝিরিঝিরি বৃষ্টিটা কমে গিয়ে আকাশে সূর্যের উকিটা চোখে পড়লো। তাই আর দেরি না করে বেরিয়ে পড়লাম দামতুয়ার উদ্দেশ্যে। আলিকদম থেকে দামতুয়া যাওয়ার একমাত্র উপায় হলো ১১ কিলো চেক পোস্ট পার হয়ে আদুপাড়া দিয়ে ট্রেইলে ঢুকে পড়া। আদুপাড়া মূলত ডিমপাহাড়ের পাদদেশেই বলা যায়। যার অপর পাশে থানচি উপজেলা আর মাঝখানে ডিম পাহাড়।

আলিকদম থেকে আদুপাড়াতে ব্রিটিশ আমলের জিপে করে যাওয়া যায়, এছাড়া বাইকে করেও যাওয়া যায়। গ্রুপে সদস্য কম হওয়ার কারনে আমরা বাইকে চড়েই আদুপাড়ার উদ্দেশ্যে রওনা হলাম। পাহাড়ি উচু নিচু রাস্তায় মোটর সাইকেলে চরার অভিজ্ঞতা আমার এবারই প্রথম। আমি সবসময় পাহাড়ি রাস্তায় মোটর সাইকেল এড়ানোর চেষ্টা করতাম তবে এবার তার সুযোগ নেই। বাধ্য হয়েই বেছে নিতে হয়েছে।

মোটর সাইকেলে উঠে কিছুদূর আগানোর পরই একটা বাজারে সকালের নাস্তা সেড়ে নেই, তারপর ঘন্টা দেড়েক পাহাড়ি উচু নিচু, খাড়া ঢালু, আকাবাকা পাহাড়ি পথ পেরিয়ে পৌছে যাই আদুপাড়ায়। সেখানে পৌছে মুরং অধিবাসি এক গাইড নিয়ে আমরা রওনা হই দামতুয়ার উদ্দেশ্যে। দামতুয়া যাওয়ার জন্য প্রথম যেই পাড়াটা পরে সেটির নাম পামিয়া পাড়া। মূল সড়ক হতে পামিয়া পাড়া যেতে প্রায় ঘন্টা খানেক সময় লাগে। তবে এই পথটুকু অতটা কষ্টকর বা বিপদজনক নয় শুধুমাত্র পাহাড়ে উঠা আর নামা ছাড়া। পামিয়া পাড়ায় খানিকটা সময় বিশ্রাম নিয়ে আমরা রওনা হই দামতুয়ার উদ্দেশ্যে। পথিমধ্যে আরো দুই একটা নাম না জানা পাড়ার দেখার মেলে অবশ্য। [প্রথম পর্ব পড়তে এখানে ক্লিক করুন]

দামতুয়া যাওয়ার পথে। ছবি কৃতজ্ঞতাঃ অর্ণব
দামতুয়া যাওয়ার পথে। ছবি কৃতজ্ঞতাঃ অর্ণব

পাহাড়ি ট্রেইলে হাটার সময় পাড়াগুলো যেনো প্রান ফিরিয়ে আনে ক্লান্তজীর্ন দেহে। কেননা এসব ট্রেইলে এক পাড়া থেকে আরেক পাড়ার দূরত্ব অনেকটা পথ। পাড়াগুলোতে বসবাস করা মানুষগুলো মনে করিয়ে দেয়, বুনো পরিবেশে অনেক ভালো থাকা যায় আর ভালো থাকতে খুব বেশী কিছুর প্রয়োজন নেই।

পামিয়া পাড়ার খেলার মাঠ। ছবি কৃতজ্ঞতাঃ জুবায়ের
পামিয়া পাড়ার খেলার মাঠ। ছবি কৃতজ্ঞতাঃ জুবায়ের

পামিয়া পাড়া যাওয়ার পথে সর্বপ্রথম দেখা মিলবে ওয়াংপা ঝিরির। তবে এই ঝিরির ঝর্নার উৎসে যেতে বেশ বেগ পেতে হয় এবং সেটার জন্যই প্রয়োজন অতিরিক্ত আরো একদিন। ওয়াংপা ঝিরি পাশ কাটিয়ে পামিয়া পাড়া থেকে দামতুয়া যাওয়ার পথে দেখা মেলে অন্যতম সেরা একটি ক্যাসকেড যা ব্যাঙ ঝিরি নামেও পরিচিত। এই ব্যাঙ ঝিরির সৌন্দর্য্য সেখানে না যাওয়া ছাড়া বর্ননা করে বুঝানো সম্ভব নয়। ব্যাঙ ঝিরি থেকে ২০-২৫ মিনিট হাটলেই চলে আসা যাবে দামতুয়া ঝর্নায়। অর্থাৎ মূল সড়ক থেকে পামিয়া পাড়া পর্যন্ত আসতে লাগবে ঘন্টা দেড়েক এবং পামিয়া পাড়া থেকে দামতুয়া যেতেও সময় লাগবে ঘন্টা দেড়েকের মত। অর্থাৎ প্রায় আড়াই তিনঘন্টার ট্রেক বলা চলে।

দূরের পাহাড়ের গায়ে মাচাং। ছবি কৃতজ্ঞতাঃ অর্নব
দূরের পাহাড়ের গায়ে মাচাং। ছবি কৃতজ্ঞতাঃ অর্নব
ব্যাঙ ঝিড়ি। ছবি কৃতজ্ঞতাঃ জুবায়ের
ব্যাঙ ঝিড়ি। ছবি কৃতজ্ঞতাঃ জুবায়ের

ঝর্না সবসময় একটি পছন্দের বিষয় আমার কাছে। ঝর্নার কাছে আসলেই মস্তিষ্ক থেকে অন্য সবকিছু চলে যায় মূহুর্তেই। ঝর্নার পানির শব্দ, ঠান্ডা পানির স্পর্শ সবকিছু এতটা ভালোলাগার যেটা হয়তো শব্দ বা বাক্যে প্রকাশ সম্ভব নয়। আমরা যখন দামতুয়া পৌছাই তখন দুপুর বারোটা কি সাড়ে বারোটা বাজে। আমরাই প্রথম গ্রুপ ছিলাম সেদিনের জন্য।

দামতুয়া ঝর্না। ছবি কৃতজ্ঞতাঃ জুবায়ের
দামতুয়া ঝর্না। ছবি কৃতজ্ঞতাঃ জুবায়ের

দামতুয়া ঝর্নায় বেশ খানিকটা সময় কাটিয়ে ফেরার উদ্দেশ্যে রওনা হই। ঘূর্নিঝড়ের প্রভাবে এদিকেও ঝিরিঝিরি বৃষ্টি শুরু হয়ে গিয়েছে। এই বৃষ্টির মধ্যে আমরা ট্রেইল ধরে হাটছি। পিচ্ছিল পথ যেনো আরো পিচ্ছিল হয়ে গেছে বৃষ্টির কারনে। ঝোপঝাড়ের জোঁকগুলো যেনো সব আমাদের পথে নেমে আসতে চাইছে। হাটছি, পা থেকে জোঁক ছাড়াচ্ছি আর খুব সতর্কতার সাথে সামনে আগাচ্ছি। কেননা, একটু অসাবধান হলেই পিচ্ছিল পথে পা পিচলিয়ে পাশের খাদে পড়ে যাওয়ার সম্ভবনা অনেকটাই বলতে হবে।

ফেরার পথে কিছুটা দূর এসে সাথে থাকা বিস্কুটটা খেয়ে কিছুটা ক্যালরি দিলাম শরীরকে। তারপর আবার হাটা। পথিমধ্যে পাহাড়িদের কাছ থেকে কালো আখ, জাম্বুরা এবং তেতুলের কিনে নিতে ভুল হয়নি। ফর্মালিন মুক্ত একদম প্রাকৃতিক ফল খাওয়াটাও এই যুগে ভাগ্যের ব্যাপার বলেই ধরে নেয়া যায়।

আসার সময়টা আলসেমী করা, অতিরিক্ত বিরতি নেওয়া এবং গ্রুপের একজনের ইনজুরির কারনে আদুপাড়ায় আসতে আসতে প্রায় বিকেল সাড়ে চারটা বেজে গেলো। পাড়া থেকে মূল সড়কে উঠে দোকান থেকে হালকা নাস্তা সেড়ে রওনা হলাম রিসোর্টের উদ্দেশ্যে। ঝিরিঝিরি বৃষ্টিটা বোধহয় আরেকটু বেড়ে গেলো। সন্ধ্যা সাতটা নাগার ভিজে চুপচুপে হয়ে রিসোর্টে ফিরলাম। ফ্রেশ হয়ে রাতের খাবারের জন্য বসে পড়ি। আজকে আলিকদমের আমাদের শেষ দিন। আর আমাদের ট্যুরের শেষদিন মানেই জম্পেশ খাওয়া দাওয়া হবে। তাই আজকের মেন্যুতে বারবিকিউ আর চাইনিজ আইটেমে সুসজ্জিত। ভরপেট খাওয়া দাওয়া শেষে রাতভর গল্প, কার্ড খেলাতে সবাই মশগুল। আবার কবে আসবে এই দিন, জানি না আমরা কেউই। একদিন পরই আবার শুরু হবে রোজকার রুটিন লুপ।

চিটাগাং এর ঐতিহ্যবাহী খাবার। ছবি কৃতজ্ঞতাঃ অর্নব
চিটাগাং এর ঐতিহ্যবাহী খাবার। ছবি কৃতজ্ঞতাঃ অর্নব

ফেরার দিন আমরা চেয়েছিলাম সরাসরি বাসে করেই আলিকদম থেকে ঢাকায় চলে আসতে। তবে আলিকদমের থেকে সব বাসই সন্ধ্যা সাড়ে সাতটায় ছাড়ে। সকালের কোনো বাস না থাকায় আসা হয়নি। তাই আমাদের প্ল্যানটা খানিকটা পরিবর্তন করে, আলিকদম থেকে চকরিয়া হয়ে চিটাগাং চলে আসি। চিটাগাং যেহেতু আসাই হয়েছে তাই চিটাগাং এর ঐতিহ্যবাহী খাবার মেজবান না খেলে কি ঠিক হবে? তাই দুপুরে মেজবান, ছনার ডাল আর কালাভুনা দিয়ে পেটপুজা করে আমরা রওনা হই ঢাকার উদ্দেশ্যে।

খরচাপাতিঃ ঢাকা থেকে আলিকদম এবং আলিকদম থেকে ঢাকার সরাসরি বাস ভাড়া জনপ্রতি ৮৫০ টাকা করে। তবে কেউ যদি চকরিয়া হয়ে আলিকদম যেতে চান সেক্ষেত্রে ঢাকা টু কক্সবাজারের বাসে উঠে চকরিয়া নেমে, সেখান থেকে ১৪ সিটের জিপে করে জনপ্রতি ৭০-৭৫ টাকা ভাড়া দিয়ে আলিকদম যেতে পারবেন। আমরা যেই রিসোর্টে ছিলাম তার নাম শৈলকুঠী। আলিকদমের অন্যতম সুন্দর রিসোর্ট। এক রুমে চারজনের মত থাকা যায়। সেক্ষেত্রে রুম ভাড়া পড়বে ১০০০ টাকা। আর সারাদিনের জন্য আমরা অটো ঠিক করেছিলাম ৯০০ টাকা দিয়ে। এক অটোতে পাচ-ছয়জন ইজিলি বসা যায়। অন্যদিকে দামতুয়া যাওয়ার জন্য মোটর সাইকেল ভাড়া মোটামুটি ফিক্সড ৭৫০-৮০০ টাকা করে যাওয়া এবং আসা। এক মোটর সাইকেলে দুজন করে উঠা যায়। আর আদুপাড়া থেকে দামতুয়া পর্যন্ত গাইড ভাড়াও ফিক্সড ১০০০ টাকা। খাওয়ার খরচ সম্পুর্ন নিজের উপর। আমরা ঘুরতে গেলে খাওয়া দাওয়াতে কখনো কনসিডার করি না, তাই আমাদের খাওয়া দাওয়াতে খরচটা একটু বেশীই হয়ে থাকে।