সান্দাকফু! পশ্চিম বঙ্গের সর্বোচ্চ চূড়া। যার উচ্চতা প্রায় ১২০০০ ফুট। এটি মূলত ভারতের শিঙ্গালিলা জাতীয় উদ্যানের কিনারায় অবস্থিত। বিশ্বের সর্বোচ্চ পাচটি পর্বত চূড়ার চারটি এভারেস্ট, কাঞ্চনজঙ্গা, লোতসে এবং মাকালু এর চূড়া দেখা যায় এই সান্দাকফুর চূড়া থেকে। প্রায় বেশ কয়েক বছর আগেই এই চূড়া সম্পর্কে জানতে পারি আর তখন থেকেই এইখানে যাওয়ার ইচ্ছে। তবে সময় আর সাধ্য দুটো ব্যাপারকে যুক্ত করতে না পারায় এতদিন যাওয়া হয়নি। চাকুরিতে ঢুকার পর থেকে সাধ্যটাকে সময়ের সাথে মিলিয়ে নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি এডভেঞ্চার ক্লাব (আনঅফিশিয়াল)-এর আয়োজনে গত বছর ১৯শে ডিসেম্বর ছয়জন মিলে ঢাকা থেকে রওনা হই সান্দাকফুর উদ্দেশ্যে। মূল উদ্দেশ্যে সান্দাকফু থাকলেও আশেপাশে গ্রাম এবং শহরকেও রেখেছিলাম ঘুরাঘুরির তালিকায়।

১৯শে ডিসেম্বর রাত ৮টায় ঢাকার শ্যামলি থেকে পঞ্চগড়ের উদ্দেশ্যে বাস ছাড়ার কথা থাকলেও সেই বাস শেষমেষ ছাড়ে রাত নয়টায়। ঘন কুয়াশা উপেক্ষা করে বাসের স্পিড উঠানো বেশ দুঃসাধ্য একটা ব্যাপার হয়েছিল ড্রাইভারের। তারপরেও স্পিড মনেস্টার এনা বলে কথা। এগারটা বাজার আগেই পৌছে গেলাম বঙ্গবন্ধু সেতু বা যমুনা ব্রীজের কাছাকাছি। ব্যাপারটা বুঝতে পেরে মোবাইলের প্লেলিস্ট থেকে সুন্দর কয়েকটা গান সিলেক্ট করে ইয়ারফোন গুজে দিলাম কানে। যাক, প্রিয় কিছু গানের লিরিক্স শুনতে শুনতে ব্রীজের জার্নিটা উপভোগ করবো। তবে বরাবরের মতই আমার কপালে বোধহয় সুখ জিনিসটা বসন্তের কোকিলের মতই। বাস তো আর আগাচ্ছে না। ব্রীজ সংস্কারের কাজ চলছে। খানিকটা দুঃখিত হয়ে ভাগ্যের এই নির্মম উপহাস মেনে নিয়ে ঝিম মেরে বসে আছি বাসের ভিতর। বাকিরা মজা করছে, গল্প করছে। আমার কাছে ভালো লাগছে না। ব্রীজের সংস্কার ঐদিন রাতে শেষ না হলেও ভাগ্যের নির্মম সংস্কার শেষ হয় প্রায় ৩ ঘন্টা পর। প্রায় ৩ ঘন্টা একই জায়গায় বসে থেকে হালকা সামনে এগুতে এগুতে যখনই বাসের স্পীডোমিটারের কাটা খানিকটা উচুতে পৌছাতে যাবে ঠিক অমনিই মধ্যরাতের খাবারের বিরতির সময় হয়ে গেছে। বিরতির মাঝে আমরাও প্রকৃতিকে খানিকটা সময় দিয়ে উদরপূর্তি ঘটাই গরুর মাংস ভূনা, পরোটা আর বিচ্ছিরি পানসে চা পানে।

২০ মিনিটের বিরতির কথা বলে প্রায় ৪০ মিনিট পর বাস ছাড়লো। সামনে আর বিরতি নেই। একদম সরাসরি পঞ্চগড়। তাই সবাই ঘুমানোর প্রিপারেশন নিলাম বাসেই। সকালে ঘুম ভাঙ্গে ছয়টার দিকে। ততক্ষনে আমরা ঠাকুরগাও। ঘন কুয়াশায় সামনের কিছুই দেখা যাচ্ছে না। এই ঘন কুয়াশা দেখে ছোটবেলার কথা মনে পড়ে যাচ্ছিলো। যখন কুয়াশার মানে ছিলো কৌতুহল আর কুয়াশার মাঝে লুকোচুরি খেলা।

প্রায় ১১ ঘন্টা জার্নি শেষে সকাল ৮টা নাগাদ আমরা পঞ্চগড়ে পৌছাই। তবে সেখানে নেমে আমরা নাস্তা করিনি। কেননা মধ্যরাতের খাবারই ততক্ষনে হজম অঙ্গে পৌছায়নি। এখন আমাদের যাবার পালা বাংলাবান্ধা ইমিগ্রেশন অফিসে। পঞ্চগড় থেকে বাংলাবান্ধা ইমিগ্রেশন অফিস প্রায় ৫০ কিলোমিটার রাস্তা। লোকাল বাস সার্ভিস থাকা সত্তেও আমরা একটা মাইক্রো রিজার্ভ করলাম। কেননা দ্রুত ইমিগ্রেশন অফিসে যেতে হবে। যত দ্রুত যেতে পারবো তত দ্রতই শিলিগুড়ি পৌছাতে পারবো। তাই আমরা ৮ সিটের একটা মাইক্রো রিজার্ভ করে নিলাম যা আমাদেরকে সরাসরি বাংলাবান্ধা ইমিগ্রেশন অফিসের সামনেই নামিয়ে দিবে।

ঘন্টা দেড়েকের মধ্যেই আমরা বাংলাবান্ধা ইমিগ্রেশনে পৌছে গেলাম। বাংলাদেশের ইমিগ্রেশন শেষ করে, ভারতীয় বর্ডার অতিক্রম করে অপারের ফুলবাড়িয়া ইমিগ্রেশন অফিসে গিয়ে ভারতীয় ইমিগ্রেশনের কাজ শেষ করলাম। বর্ডার থেকেই টাকা/ডলার রুপীতে ভেঙ্গে নিলাম। ঘড়ির কাটা আধাঘন্টা পিছিয়ে দিয়ে, দুটো অটো রিজার্ভ করে সরাসরি চলে এলাম শিলিগুড়ি টাউনে।

এপারের সীমান্তঘেষা জেলা পঞ্চগড় ঠিক যতটা না উন্নত অপারের সীমান্তঘেষা জেলা শিলিগুড়ি ঠিক তার চেয়ে অনেকটা বেশী উন্নত। শিলিগুড়ি শহরের মানুষ বাংলাতেই কথা বলে। শিলিগুড়িতে পৌছাতে আমাদের প্রায় দুপুর ২টা। গতরাতের উদরপূর্তির পর সকাল থেকে এখন অবদি পেটে কিছু জোটেনি। তাই সাথে থাকে টিমমেট অর্নবের সাজেশনে শিলিগুড়ি নেমে সরাসরি চলে গেলাম এক খাবার হোটেলে। যেখানের কাচ্চি নাকি বেশ ভালো। আমাদের ট্যুরগুলোতে সবকিছুতে কম্প্রোমাইজ করলেও খাবারের ব্যাপারে কোনো কম্প্রোমাইজ নেই। তাই ভালো কিছু আছে আশেপাশে সেটা জেনেও যাবো না? তা হবে না।

মানেভাঞ্জন যাওয়ার পথে - ছবিঃ অর্নব
মানেভাঞ্জন যাওয়ার পথে – ছবিঃ অর্নব

যতটা ভালো খাবার আশা করেছিলাম, খাবারের মান আসলে অতটা না। ভারতের কলকাতাতেও আমি কাচ্চি খেয়ে মজা পায়নি। সে যাই হোক, দুপুরের পেটের পুজো হয়েছে এতেই সবাই খুশী। খেয়ে দেয়ে প্ল্যান অনুযায়ী সুমো রিজার্ভ করে রওনা হলাম মানেভাঞ্জনের উদ্দেশ্যে। কোলাহল পূর্ন শিলিগুড়ি শহরকে আস্তে আস্তে দূরে ঠেলে দিয়ে পাহাড়ি আকাবাকা রাস্তা দিয়ে যতই সামনে এগুচ্ছি, প্রকৃতি যেনো আপন করে নিচ্ছে। বিকালের সূর্যটাও লালচে হলুদ বর্ন ধারন করে স্বাগত জানাচ্ছে ভিনদেশীদের। দীর্ঘ প্রায় ৩ ঘন্টার জার্নি শেষ করে সন্ধ্যা ৭টা নাগাদ প্রায় ৬ হাজার ফুট উঁচু গ্রাম মানেভাঞ্জন পৌছাই। ভারত আর নেপালের সীমান্তঘেষা এই গ্রামের এক অংশ ভারতে আর এক অংশ নেপালে পড়েছে। এই গ্রামের অধিকাংশ মানুষই নেপালী। তারা নেপালী আর হিন্দী ভাষায় কথা বলতে জানে শুধু। এখানে বাংলার চল নেই। তবে মজার ব্যাপার হচ্ছে, ঢাকা থেকে এই জায়গার নাম আমি মনোভঞ্জন বলেই জানতাম। এখানে এসে জানলাম আসল উচ্চারন মানেভাঞ্জন। মূলত সান্দাকফুতে যারা ট্রেকিং করে যায় তাদের জন্য মানেভাঞ্জন হচ্ছে এক প্রকার বেজ ক্যাম্প। কেননা এখান থেকে সান্দাকফু যাওয়ার গাইড/পোর্টার এবং আনুষঙ্গিক ফর্মালিটিস সম্পন্ন করতে হয়।

মানেভাঞ্জন যাওয়ার পথে - ছবিঃ জুবায়ের
মানেভাঞ্জন যাওয়ার পথে – ছবিঃ জুবায়ের

পাহাড়ি গ্রামে রাত নামে খুব দ্রুত। তাই আর সময় নষ্ট না করে নেপালী এক হোমস্টেতে উঠে পড়লাম আমরা। রাতের খাবারের ব্যবস্থা হোমস্টের মালিকই করে দিবে। রুমে ঢুকে প্রচন্ড ঠান্ডা পানিতে ফ্রেশ হতেই শরীরে শিহরে উঠলো। হাত দিতে পারছিলাম না পানিতে। কয়েক সেকেন্ড হাত রাখলেই জমে যাচ্ছে এমন এক ব্যাপার ঘটে চলছে। নাতিশীতোষ্ণ অঞ্চলের এই আমরা প্রচন্ড শীতে কখনোই অভ্যস্ত ছিলাম না। তাই প্রায় ১-২ ডিগ্রী সেলসিয়াস তাপমাত্রায় মানিয়ে নিতে বেশ বেগ পেতে হচ্ছিলো।

রাত আটটার মধ্যে পাহাড়ি শাঁক, মুরগী, ডাল আর আঠালো ভাত দিয়ে ডিনার শেষ করে ঘুমানোর প্রিপারেশন নিয়ে ফেললাম। এখানে রাতে বের হয়ে ঘুরাঘুরির কোনো মানেই নাই। আর সেটা এক প্রকার অসম্ভব কাজ প্রচন্ড ঠান্ডার কারনে। তাই আর দেরী না করে সবাই দ্রুত শুয়ে পড়লাম। পরেরদিন আমাদের কাংখিত লক্ষ্য সান্দাকফুর উদ্দেশ্যে রওনা হবার প্ল্যান।

টিপসঃ ঢাকা থেকে সরাসরি শিলিগুড়ির বাস থাকা সত্তেও সিট না পাওয়ার কারনে আমাদের ভেঙ্গে ভেঙ্গে যেতে হয়েছে। তবে পঞ্চগড় থেকে রিজার্ভ মাইক্রো না নিয়েও লোকাল বাসে যাওয়া যায়। টিমে সদস্য সংখ্যা ৬-৮ জন হলে রিজার্ভ মাইক্রো নিলে খরচ এবং সময় দুটোই কম লাগবে। সাধারনত দামাদামি করলে ১৫০০-২০০০ এর টাকাতেই ৮-১০ সিটের মাইক্রো রিজার্ভ করে বাংলাবান্ধা যাওয়া যায়। বাংলাদেশ ইমিগ্রেশন অংশে জনপ্রতি ১০০ টাকা দিতে হয় অন্যদিকে ভারতের অংশে জনপ্রতি ২০০ টাকা মাস্ট। টাকা/ডলার দুটোই সাথে করে নেয়া যায় কোনোটাই চেক করে না। তবে টাকা বা ডলার বর্ডার এলাকাতে ভাঙ্গানো উত্তম, রেট ভালো পাওয়া যায় আর শিলিগুড়িতে এসব মানি এক্সচেঞ্জ খুজে বের করাটাও বেশ ঝামেলার। বর্ডারের মানি এক্সচেঞ্জগুলোতে অনেক সিন্ডিকেট। সবগুলাতে প্রায় রেট একই। তবে রাজধানী আর মজুমদারে রেট বেশী পাওয়া যায় তুলনামূলক। তবে সাজেশন থাকবে খুব বেশী মানি এক্সচেঞ্জ না ঘুরে যেকোনো একটায় ঢুকে পরা না হলে বেশী ঘুরলে অনেক ঝামেলা পোহাতে হয়।
শিলিগুড়ি থেকে দুপুর ৩টার পর সাধারনত মানেভাঞ্জনের উদ্দেশ্যে কোনো রিজার্ভ গাড়ি/সুমো পাওয়া যায় না। তাই চেষ্টা রাখা উচিত তিনটার আগেই গাড়ি রিজার্ভ করার। সাধারনত দামাদামি করে শিলিগুড়ি থেকে মানেভাঞ্জন পর্যন্ত ৬-৮ সিটের সুমো গাড়ির ভাড়া ২০০০-২৫০০ রুপির মধ্যেই ঘোরাফেরা করে। মানেভাঞ্জনে হোটেল থাকা সত্তেও হোমস্টেগুলোতে থাকা ভালো। কেননা হোমস্টে গুলোতে খাবারের দাম এবং রুম ভাড়া বেশ কম। ১০০০-১২০০ রুপিতে ৫-৬ সিটের ডর্মিটরি টাইপে রুম পাওয়া যায় মানেভাঞ্জনে।