প্রচন্ড শীতে কাতরাতে কাতরাতে কখন যে রাতে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম সেটি ঠিক মনে নেই। তবে খুব ভালো না হলেও মোটামুটি ঘুম হয়েছে। তবে শীতের সকালে লেপ/কাথার মারপ্যাচ পেরিয়ে বিছানা থেকে উঠা এক প্রকার চ্যালেঞ্জিং কাজ বৈকি। তারপরেও উঠতে হবে। মারপ্যাচের ঝামেলা কাটিয়ে বরফসমান ঠান্ডা পানি দিয়ে ফ্রেশ হয়েই চলে গেলাম নাস্তার জন্য। রুটি, ডিম মাখানি, সন্দেশ, সবজি দিয়ে নাস্তা সেড়ে গরম গরম ধোয়া উড়া কফি পান করে সোজা চলে গেলাম সান্দাকফুর জন্য গাইড ঠিক করতে। গাইড ঠিক করে চলে গেলাম সিঙ্গলীলা বনের পারমিশনের জন্য। পাসপোর্ট আর ভিসার জ্যারক্স কপি জমা দিয়ে নিয়ে নিলাম পারমিশন। গাইড এবং পারমিশন দুটোই ম্যানেজ হয়ে গেছে এখন শুধু গাড়ি রিজার্ভ করতে হবে। মানেভাঞ্জন থেকে সান্দাকফুর গাইড এবং রিজার্ভ গাড়ির ভাড়া মোটামুটি ফিক্সড, তাই এখানে দর কষাকষির কিছু নেই। কাউন্টার থেকে প্রায় ৭০ বছরের পুরোনো ল্যান্ড রোভার রিজার্ভ করে নিলাম সান্দাকফু যাওয়ার জন্য। এত পুরোনো গাড়ি দিয়ে বিশ্বের অন্যতম উচ্চতম ও বিপদজনক সড়ক পাড়ি দিতে হবে এটা ভাবতেই গা শিউরে উঠছে।

মানেভাঞ্জনের হোটেল থেকে সকালের দৃশ্য - ছবিঃ জুবায়ের
মানেভাঞ্জনের হোটেল থেকে সকালের দৃশ্য – ছবিঃ জুবায়ের

ব্যাগপ্যাক ল্যান্ড রোভারের ছাদে তুলে দিয়ে আমরা ভিতরে বসে নিলাম। আমাদের ছয়জনের জন্য একদম পারফেক্ট মনে হচ্ছে এই গাড়িটি। সাথে রয়েছে আমাদের গাইড রোনাল্ড। আঁকাবাঁকা পাহাড়ি রাস্তা পেরিয়ে মিনিট চল্লিশের মধ্যেই আমরা পৌছে গেলাম চিত্রে। এখানে আমাদের হালকা বিরতি। চিত্রে অস্বাভাবিক সুন্দর এক গ্রাম। শীতের রুক্ষতা এই গ্রামে বেশ জোড়েসোরেই ভর করেছে। চারিদিকের সবুজ প্রকৃতি কেমন যেনো রসহীন হয়ে বাদামী রঙ ধারন করেছে। বেশ খানিকটা সময় চিত্রে কাটিয়ে আমরা আবারো রওনা হলাম।

ছবির মত সুন্দর গ্রাম চিত্রে - ছবিঃ জুবায়ের
ছবির মত সুন্দর গ্রাম চিত্রে – ছবিঃ জুবায়ের

বোল্ডার বিছানো রাস্তায় ল্যান্ড রোভার চলছে বেশ ভালো গতি নিয়েই। চিত্রে থেকে রওনা হয়ে প্রায় আধাঘন্টা পর আমরা পৌছে গেলাম প্রায় সাড়ে আটহাজার ফুট উঁচু গ্রাম মেঘমাতে। এখানেও আমাদের খানিকটা যাত্রা বিরতি। চিত্রে আকাশ বেশ ঝলমলে থাকলেও এখানে একদম মেঘলা হয়ে আছে। কুয়াশা আর মেঘের আনাগোনায় আশেপাশে কোনো কিছুই তেমন একটা দেখা যাচ্ছে না। তবে কুয়াশা আর মেঘ না থাকলে এখান থেকেও কাঞ্চনজঙ্গার বেশ ভালো দৃশ্য চোখে বন্দী করা সম্ভব।

মেঘমাতে মূলত ছোটখাটো একটা খাবারের বিরতি দেয়া। গাড়ির ড্রাইভার ও গাইড সবাই নাস্তা করছে। তাই আমরাও এই ফাকে কিছুটা পেট পুজা দেয়ার জন্য একটা দোকানে ঢুকে পড়ি। সেখানে চিকেন মোমো অর্ডার করে বসি। বেশ স্বাদ ছিলো চিকেন মোমোর। মোমো শেষ করে চিপস আর আর কফি দিয়ে দারুন একটা ডেজার্টও হয়ে যায়।

টুমলিং হতে - ছবিঃ সুস্মিতা
টুমলিং হতে – ছবিঃ সুস্মিতা

খাওয়া দাওয়া শেষ করে এইবারের গন্তব্য আমাদের টংলু হয়ে টুমলিং। মেঘমা থেকে রওনা হয়ে প্রায় ঘন্টা দেড়েক পর আমরা পৌছায় প্রায় দশ হাজার ফুট উঁচু গ্রাম টুমলিং এ। এখানেও আমরা খানিকটা বিরতি দেই। বেশ কিছু ফটোসেশনের পর আমরা রওনা হই আমাদের মূল গন্তব্য সান্দাকফুর উদ্দেশ্যে। তবে টুমলিং থেকে রওনা হওয়ার কিছুক্ষন পরেই পথে দেখা মিলে বরফের। প্রায় এক সপ্তাহ আগে হওয়া স্নোফলের বরফগুলো এখনো জমে আছে রাস্তায়। জীবনের প্রথম এরকম বরফ দেখতে পাওয়া। চোখে মুখে বিস্ময়ের ছাপ নিয়ে সবাই দেখছে রাস্তায় জমে থাকা বরফগুলো।

পথিমধ্যে গাড়ি নষ্ট হয়ে যাওয়া - ছবিঃ হাসান
পথিমধ্যে গাড়ি নষ্ট হয়ে যাওয়া – ছবিঃ হাসান

কিছুটা সময় পর ভাগ্যের প্রতিকূল আচরনে আমাদের গাড়ি বন্ধ হয়ে গেলো। পিছনের চাকার কি যেনো ভেঙ্গে গেছে। সেটা এখন ঠিক করতে হবে। ৭০ বছরের পুরোনো এই গাড়ির উপর এখনো যে ১২ হাজার ফুটের অত্যাচার করানো হয়, সেটাতো মাঝে মাঝে মান অভিমানে বুক ভাসাবেই। তবে এটা নাকি স্বাভাবিক। এই পথে অন্তত একবার হলেও এই ল্যান্ড রোভার নষ্ট হবেই। সবাই গাড়ি থেকে নেমে পড়লাম। ড্রাইভার এবং তার সহযোগিরা মিলে গাড়ি ঠিক করছে।

সবকিছু ঠিকঠাক করার পর আমরা আবারো রওনা হলাম। বেশ কিছুটা সময় পর যখনই দেখলাম সান্দাকফু মাত্র ১০ কিলোমিটার তখন চোখেমুখে আনন্দের ছায়া পড়ে গেলো। কিন্তু এই আনন্দের ছায়াটা পুরোপুরি মলিন করে দিলো পাথুরে আর প্রচন্ড খাড়া রাস্তা। খুব ধীরে আর সতর্কতার সাথে গাড়ি চলছে। এই ১০ কিলোমিটার যেনো শেষই হচ্ছে না। এক ঘন্টা পর যখন আমরা ভারতের সীমানা শেষ করে নেপালের সীমানায় প্রবেশ করলাম তখন মনে হচ্ছে প্রচন্ড ঠান্ডা ঝেঁকে বসেছে। হাত পা জমে যাচ্ছে একদম। তার উপর প্রচন্ড ঠান্ডা বাতাস। এই বিরূপ আবহাওয়াকে সঙ্গি করে আমাদের সবচেয়ে ভয়াভয় তিন কিলোমিটার রাস্তা পাড়ি দিতে হবে। কিছুদিন আগেও নাকি বরফের কারনে এই রাস্তা দিয়ে গাড়ি উঠানো যায়নি। তাই পর্যটকরা এই তিনকিলোমিটার পায়ে হেটেই যেতে হয়েছে। তবে এখন বরফ তেমন একটা নেই, তাই গাড়ি নিয়েই একদম উপর পর্যন্ত যাওয়া যাবে।

কালপোখারির পবিত্র লেক, এটি মূলত নেপাল অংশে পড়েছে - ছবিঃ জুবায়ের
কালপোখারির পবিত্র লেক, এটি মূলত নেপাল অংশে পড়েছে – ছবিঃ জুবায়ের

গাড়ি আরো ধীর গতি এবং আরো বেশী সতর্কতার সাথে এগুচ্ছে। ভিতর থেকে বাইরে তাকালে বুক ধরফর করে উঠে। মনে হচ্ছে এই বুঝি পরে গেলাম ১২ হাজার ফুট নিচে। এই তিনকিলোমিটার যেনো আর শেষ হচ্ছে না। ১০ মিনিট, ২০ মিনিট, ৩০ মিনিট এভাবে প্রায় দেড় ঘন্টা পর আমরা পৌছাই সান্দাকফুতে। আমাদের গাড়ি গিয়ে থামে সান্দাকফুর অন্যতম সুন্দর এবং উঁচু রিসোর্ট হোটেল সানরাইজের সামনে। সান্দাকফুর ভালো রিসোর্টগুলোর মধ্যে একটি এই হোটেল সানরাইজ। তাই আমরা অন্য রিসোর্ট আর না খুজে এখানেই ৭ সিটের একটা রুম বুক করে নিলাম। তিনতলা এই রিসোর্টের দোতলায় একদম কাঞ্জনজঙ্গা ভিউ রুমটাই আমরা বেছে নেই।

সান্দাকফু - ছবিঃ হাসান
সান্দাকফু – ছবিঃ হাসান

রুমে ব্যাগ রেখে বরফ পানিতে হাত ছোয়ায়ে ফ্রেশ হই কোনোরকম। এদিকে ঘড়িতে দুপুর আড়াইটার জানান দিয়ে দুপুরের খাবারের কথা বলছে। আমরাও দুপুরের খাবারটা শেষ করে নিলাম। খাবার খেয়ে হোটেল থেকে বের হলাম আশপাশটা ঘুরার জন্য। পুরো সান্দাকফু যেনো বরফের রাজ্য হয়ে আছে। অন্যদিকে কুয়াশার কারনে ১০ মিটার সামনে কি আছে সেটিই দেখা যাচ্ছে না। প্রচন্ড ঠান্ডা বাতাস আর মাটিতে ঘন বরফ হওয়ার দরুন খুব বেশীক্ষন বাইরে থাকা সম্ভব হচ্ছে না। তাই কয়েকটা ছবি তুলে চলে এলাম হোটেলে।

হোটেলে আমাদের রুমে কিছুটা সময় কাটিয়ে সন্ধ্যার দিকে নিচে নেমে আসলাম। দেখলাম আরো অনেকে মিলে বসে গল্প করছে আর আগুন পোহাচ্ছে ভিতরেই। আমরাও যোগ দিলাম তাদের সাথে। চা আর কফির যোগে নানান রকম মানুষের সাথে গল্পটাও বেশ জমছিলো। অন্যদিকে রাত যতই বাড়ছে ঠান্ডা ততই বেড়ে চলেছে।

রাতভর আড্ডা আর আগুন পোহানো - ছবিঃ হাসান
রাতভর আড্ডা আর আগুন পোহানো – ছবিঃ হাসান

রাত আটটা বাজতেই হোটেলের ম্যানেজার জানান দিলো ডিনারের জন্য। সবজি, ডিম কারি, ভাত, ডাল আর পাপর ভাজা দিয়ে ডিনার শেষ করে আমরা আবারো গল্পে মেতে উঠলাম। আস্তে আস্তে অনেকেই গল্পের আসর থেকে বিদায় নিচ্ছে। কিন্তু আমরা এখনোও বসে গল্প করছি। রাত প্রায় বারোটা পর্যন্ত গল্প করে রুমে ফিরেই শোবার প্রস্তুতি। গায়ে মোটা এয়ার প্রুফ জ্যাকেট, জিন্সের প্যান্ট এবং এর উপর তিন লেয়ারের কম্বল দিয়েও ঠান্ডা কমানো যাচ্ছে না। সাত হাজারের বেশী উচ্চতা হওয়ায় অক্সিজেনের সল্পতা আর প্রচন্ড ঠান্ডা আমাদের বেশ ভালোই কাবু করে ফেলেছে। তারপরেও স্বাভাবিক ভাবে থাকার চেষ্টা করছি। এই চোখ লাগে এই ভেঙ্গে যায়। এইভাবেই রাতের মূহুর্তগুলো পার করছি। আর মনে মনে চাইছি দ্রুত সকাল হোক, খুব দ্রুত সকাল হোক।

টিপসঃ মানেভাঞ্জন থেকে সান্দাকফু যাওয়ার ল্যান্ড রোভারের ভাড়া মোটামুটি ফিক্সড। সেখানে চার্ট করে দেয়া আছে। আর গাইড দিন প্রতি ১০০০ রুপি। গাইডের খাওয়ার ও থাকার খরচ ১০০০ রুপির মধ্যেই ইনক্লুডেড। তেমনি ল্যান্ড রোভারের ড্রাইভারদের থাকা ও খাওয়ার খরচও ভাড়ার মধ্যে ইনক্লুডেড। সান্দাকফুতে নন ভেজ আইটেম সাধারনত পাওয়া যায় না। তাই ভেজ আইটেম দিয়েই উদরপূর্তি করতে হবে। সান্দাকফুর কটেজগুলোতেও খাবারের দাম মোটামুটি ফিক্সড। মিল হিসেবে খাওয়া দাওয়া হয় সেখানে। প্রতি মিল ২০০ রুপি থেকে শুরু করে আইটেম কম বেশীতে দামের কম বেশী হয়। পাহাড়ি ও দুর্গম এলাকা হওয়ায় খাবারের দাম বেশ বেশী। 
সানরাইজ ছাড়াও আরো অনেক কটেজ আছে সেখানে। তবে বাকিগুলোর থাকার খরচ সানরাইজ থেকে কম। সানরাইজ হচ্ছে তুলনামূলক এক্সপেন্সিভ কটেজ। সাত সিটের রুমে আমাদের খরচ পড়েছিলো ৩০০০ রুপি। দর কষাকষির ব্যাপার আছে এখানে। তাই দর কষাকষি করে বেশ কিছুটা কমানো যায়। সান্দাকফুতে উচ্চতাজনিত সমস্যা এবং ঠান্ডা জনিত সমস্যা দেখা দিতে পারে। তাই সাথে হাই এল্টিটিউট সিকনেস রিলেটেড মেডিসিন, যেমনঃ ইনহেলার সাথে রাখা ভালো। প্রয়োজন হতে পারে। 
ল্যান্ড রোভারগুলো সাধারনত ছয় থেকে সাতজন বসা যায়। তবে ছয়জন আরামভাবে বসা যায়। তাই সান্দাকফুতে ল্যান্ড রোভারে গেলে ছয়জনের টিম হলে খরচ অনেকটাই কমে যাবে।