মাইনাস ৪-৫ ডিগ্রী তাপমাত্রা আর উচ্চতাজনিত কারণে রাতে কেউই ভালো মত ঘুমাতে পারিনি। কখনো চোখ লেগে এসেছিলো আবার কখনো ঠান্ডার কাঁপুনিতে ঘুম ভেঙ্গে যাচ্ছিলো। সবমিলিয়ে এক ভয়াবহ অভিজ্ঞতা। তাই এই আধোঘুমেই সবাই ভোরের জন্য অপেক্ষা করছিলাম, কখন ভোর হবে আর কখন ঘুমন্ত বুদ্ধকে দেখতে পাবো। অবশেষে অপেক্ষার পালা শেষ হতে চললো। কিছুটা অন্ধকার থাকতেই সবাই তৈরী হয়ে চলে গেলাম হোটেলের ছাঁদে। পুরো ছাদ যেনো বরফের চাদরে ঢেকে আছে। খুব সাবধানতার সাথে ছাদে হাটতে হচ্ছে। জুতো বেশ ভালোই স্লীপ খাচ্ছে। দুই লেয়ারের জ্যাকেট এবং ভিতরে থার্মাল ইনার আর সোয়েটার পরেও প্রচন্ড ঠান্ডা বাতাসের কাপুনি একদম হাড়ে গিয়ে লাগছে। মোবাইলের ক্যামেরা বাটনে ট্যাপ করার জন্য মাত্র কয়েক সেকেন্ডের জন্য হাত মৌজা খুলতেই যেনো হাত জমে যাচ্ছে এমন এক অবস্থা। অবশেষে চারদিকে লাল আভা ছড়িয়ে সূর্য উকি দিচ্ছে অল্প অল্প করে। আর আমাদের চোখজুড়ে যেনো শুধুই বিস্ময়। এই যেনো এক অপরূপ দৃশ্য। এই দৃশ্যকে ক্যামেরা বন্দী করা যাবে না, শুধুই উপভোগ করতে হবে চোখের দৃষ্টিতে। কাঞ্চনজঙ্ঘা, মাকালু, লোতসে, এভারেস্ট প্রতিটা চূড়া একদম স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। আর অন্যদিকে মেঘের উড়াউড়ি। মনে হচ্ছে সান্দাকফু আসার ১৬ আনাই পূরন হয়েছে আমাদের।

সান্দাকফু থেকে কাঞ্চনজঙ্গা (ঘুমন্ত বুদ্ধ) - ছবি কৃতজ্ঞতাঃ অর্ণব
সান্দাকফু থেকে কাঞ্চনজঙ্গা (ঘুমন্ত বুদ্ধ) – ছবি কৃতজ্ঞতাঃ অর্ণব

গতকালের আবহাওয়া এতটাই খারাপ ছিলো, তাই আমরা ভেবেছিলাম আজ বোধহয় আমরা কাঞ্চনজঙ্গাই দেখতে পাবো না। কিন্তু সান্দাকফু আমাদের হতাশ করে ফিরায়নি। আমরা শুধু কাঞ্চনজঙ্গা নয়, আরো কয়েকটা পর্বত চূড়া খুব স্পষ্টই দেখতে পেরেছি। বেশ অনেকটা সময় কাটিয়ে, হালকা নাস্তা করে যখন হোটেল চেক আউট করে মানেভাঞ্জনের পথে ফিরছি তখন ফালুট, গোরখের জন্য মন খারাপ হলেও পুরোটাই পথ জুড়েই ঘুমন্ত বুদ্ধ আমাদের সাথে থেকে মন ভালো করেই যাচ্ছিলো। এতটা সুন্দর আবহাওয়া ছিলো, পুরো পথের যেখানেই থেমেছি সেখান থেকেই দেখা মিলছিলো ঘুমন্ত বুদ্ধকে। মূলত কাঞ্চনজঙ্ঘা চূড়াকেই ঘুমন্ত বুদ্ধ বা স্লিপিং বুদ্ধা বলা হয়ে থাকে। কেননা দূর থেকে এর চূড়াকে ভালো করে লক্ষ্য করলে মনে কে যেনো পাহাড়ের উপর শুয়ে আছে ভূড়ি উঁচু করে। হা হা হা। উপরের ছবিটির (বাঁ দিক থেকে) কুম্ভকর্ণ, কাঞ্চনজঙ্ঘা এবং পাণ্ডিম শৃঙ্গ একসঙ্গে যেন শুয়ে থাকা কোন মানুষ। এই তিন শৃঙ্গ একসঙ্গে ‘স্লিপিং বুদ্ধ’ নামেই পরিচিত।

পথিমধ্যে আবারো ঘুমন্ত বুদ্ধের দেখা মিলছে - ছবি কৃতজ্ঞতাঃ জুবায়ের
পথিমধ্যে আবারো ঘুমন্ত বুদ্ধের দেখা মিলছে – ছবি কৃতজ্ঞতাঃ জুবায়ের

দুপুরের মধ্যেই আমরা মানেভাঞ্জন পৌছে যাই। মানেভাঞ্জন নেমে ইচ্ছে ছিলো অজয়দা’র হোমস্টেতে দুপুরের খাবার খেয়ে নিবো। কিন্তু সেটা হয়নি। দাদাও ক্রিসমাসের ছুটিতে সপরিবারে দার্জেলিং ঘুরতে গিয়েছেন। তাই হালকা কিছু খেয়ে আমরা দেরি না করে মেঘের দেশ ধোত্রের উদ্দেশ্যে রওনা হলাম। মানেভাঞ্জন থেকে ধোত্রে যাওয়ার রাস্তাটা বেশ ভালো এবং খুব একটা দূর নয়। ঘন্টা দেড়েকের মত লাগে। দুপুর তিনটার মধ্যেই পৌছে গেলাম ধোত্রে।

মেঘের দেশ ধোত্রে - ছবি কৃতজ্ঞতাঃ জুবায়ের
মেঘের দেশ ধোত্রে – ছবি কৃতজ্ঞতাঃ জুবায়ের

ধোত্রে একদম ছবির মত সুন্দর একটা গ্রাম। এটিও একটি নেপালী গ্রাম। খুবই পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন। এই গ্রামকে মেঘের দেশ বলার কারন হচ্ছে, উপর থেকে এই গ্রামকে দেখলে মনে হবে মেঘের মধ্যে ডুবে আছে। নানান রঙের ফুল আর নানান রঙের ঘরের দেয়াল এই গ্রামকে রঙ্গিন করে তুলেছে অন্যান্য গ্রাম থেকে। পাইন গাছের বন আর বনের মাঝ দিয়ে চলে যাওয়া পথটুকু দেখলে আমি নিশ্চিত যেকেউ ইউরোপের কোনো দেশের সাথে তুলনা করতে ভুল করবে না।

ধোত্রের প্রতিটি বাড়ির বাইরের দেয়াল এভাবে সাজানো - ছবি কৃতজ্ঞতাঃ জুবায়ের
ধোত্রের প্রতিটি বাড়ির বাইরের দেয়াল এভাবে সাজানো – ছবি কৃতজ্ঞতাঃ জুবায়ের

ধোত্রেতে এক দিদির গেস্ট হাউজে রুম বুকিং করে চলে গেলাম দুপুরের খাবার খেতে। কিন্তু বিধিবাম, এই গ্রামে হাতে গোনা যে কয়টা খাবারের দোকান আছে সেখানে সবজি মম আর নুডুলস ছাড়া কিছুই মেলে না। তাই এই সবজি মম দিয়েই দুপুরের পেটপূজো করলাম।

মন্দিরে ঢুকার পথে - ছবি কৃতজ্ঞতাঃ জুবায়ের
মন্দিরে ঢুকার পথে – ছবি কৃতজ্ঞতাঃ জুবায়ের

ততক্ষনে প্রকৃতি বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যার জানান দিচ্ছে। আমরাও এই ছোট্ট মেঘেদের গ্রামে ঘুরে বেড়াচ্ছি। এই গ্রামে বেশ সুন্দর একটা মন্দির আছে। মন্দিরের ভেতর দিয়ে একটু সামনে আগালেই দেখা মিলবে বিশাল পাইন গাছের বন। এই বনে নাকি বন্য পশু আছে। তাই অন্ধকার হয়ে যাওয়াতে খুব একটা এক্সপ্লোর করিনি বনের ভেতর। আগামীকালের জন্য রেখে দেয়া হয়েছে।

অন্ধকার নামতে নামতেই চলে এলাম দিদির গেস্ট হাউজে। এসে ফ্রেশ হয়ে খানিকক্ষন আড্ডা দিয়ে দিদির বানানো ভাত, মুরগির মাংস, ডাল আর সবজি দিয়ে রাতের খাবার টুকুনও সেড়ে নিলাম। এখানেও প্রচন্ড ঠান্ডা। তবে সান্দাকফুর মত অতটা নয়। গতকাল রাতে কেউ ঠিক মত ঘুমাতে পারেনি বলে সবাই বেশ ক্লান্ত। তাই আজ আর রাত জাগা নয়। শুয়েই খুব দ্রুত ঘুমের রাজ্যে সবাই।

টিপসঃ মানেভাঞ্জন থেকে ধোত্রে যেতে রিজার্ভ সুমো নিতে হবে। ৬ জন বেশ ভালো মতই বসা যায়। মানেভাঞ্জন থেকে ধোত্রে যেতে ঘন্টা দেড়েকের মত লাগবে, তবে এই রুটে ভাড়া তেমন একটা ফিক্সড না। একটু দরদাম করলে কমে সুমো রিজার্ভ করা সম্ভব। আমাদের ১৫০০ রুপী লেগেছিলো মানেভাঞ্জন থেকে ধোত্রে সুমোতে যেতে। ধোত্রেতে অনেক ছোট ছোট হোম স্টে আছে। তবে আমরা যে দিদির হোম স্টেতে ছিলাম এটি বেশ সুন্দর ও পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন ছিলো।
ধোত্রেতে খাবারের দোকান নেই বললেই চলে। আর যা আছে সেগুলোতে শুধু মোমো আর নুডুলস ছাড়া তেমন কিছুই পাওয়া যায় না। তাই যে হোমস্টেতে থাকবেন সেখানে বললেই উনারা ভাত, মাংস, ডালের ব্যবস্থা করে দিবেন। খরচ একটু বেশী পড়বে এই আর কি। তবে মোমো দাম খুবই কম।