কোথায় ঘুরতে গেলে ঘুমটাকে বিসর্জন না দিলে অনেক কিছুই বাদ পরে যায়। তাই এই জিনিসটা বিসর্জন করতেই হয়। তাই সকাল সকাল সবাই ঘুম থেকে উঠে পড়লাম। উঠে, তৈরী হয়ে বেরিয়ে পড়লাম ধোত্রের আশপাশটা ঘুরে দেখার। পাইন গাছের বিশাল জঙ্গলের মাঝখান দিয়ে পাহাড় কাটা মাটির রাস্তায় খয়েরি রঙের ঝড়ে পড়া পাতাগুলোও জানান দিচ্ছে বছরের শেষ সময়ের শীতের তীব্রতা। তারপরেও পাইন গাছ যেনো চিরসবুজ। শীতের এই তীব্রতায় পাইন গাছের সবুজাভ কিছুটা কম হলেও সতেজতা ছিলো অনেকটাই। আর এই মোহেই আমরা জঙ্গলের পথ ধরে সামনে এগুচ্ছি।

স্থানীয় লোকজনের মতে, এই জঙ্গলে নানান ধরনের বুনো প্রাণী আছে। কিছু হিংস্র প্রাণীও নাকি রয়েছে। এদের মধ্যে ভাল্লুকটাকে প্রায়শই দেখা যায়। ভাগ্য নিতান্তই খারাপ না হলে এই ভাল্লুকের দেখা মিলে না। সকালে স্নিগ্ধতা, শীতের তীব্রতা আর মেঘের আচ্ছাদন পুরো পরিবেশটাকে অন্যরকম একটা রূপ দিয়েছে। আর রূপে আকর্ষনেই হেটে চলছি সামনে আর এরই ফাঁকে কেউ গাইছে জন ডেনভারের বিখ্যাত সেই গান, Country roads, take me home To the place I belong…

ধোত্রের সেই পাহাড় কেটে বানানো মাটির পথে - ছবি কৃতজ্ঞতাঃ রায়হান
ধোত্রের সেই পাহাড় কেটে বানানো মাটির পথে – ছবি কৃতজ্ঞতাঃ রায়হান

আমরা মাঝে মাঝে দেশের নানান জায়গাকে নানান দেশের বিখ্যাত পর্যটক এলাকার সাথে তুলনা করি। ঠিক এই মূহুর্তে যদি ধোত্রেকে তুলনা করতে বলা হয় তাহলে আমি বলবো, ইউরোপের কোনো একটা দেশের সাথে। সেটা হতে পারে স্কটল্যান্ড। কেননা মুভি বা ডকুমেন্টরি যাই বলি না কেনো, স্কটল্যান্ডের যেই পথঘাট দেখা হয়েছে তাতে ধোত্রের এই সৌন্দর্য্য কোনো অংশ কম নয়। হাটতে হাটতে আমরা বিশাল এক মাঠের মধ্যে চলে আসি। দেখে মনে হচ্ছে ফুটবল মাঠ। কিন্তু পুরো মাঠই খালি পড়ে আছে, কেউ খেলছে না। হয়তো আজকে খেলার কোনো সময় তালিকা নেই অথবা অন্য কোনো কারন। মাঠ পেরিয়েও পাহাড়ের ঘা ঘেঁষে চলা মাটির রাস্তাটুকু আরো অনেক দূর এগিয়ে গিয়েছে। শুনেছি এই পথ ধরে হাটলে নাকি টংলু কিংবা টুমলিং পর্যন্ত যাওয়া যায়। যারা ট্রেকিং করে সান্দাকফু যেতে চায়, তাদের অনেকেই ধোত্রের এই পথ ধরেই টংলু বা টুমলিং পর্যন্ত যায়। কেননা এই পথের মত স্নিগ্ধতা সান্দাকফুর কংক্রিটের পথে নেই। তাছাড়া বেশ কয়েকটা বাচ্চা নেপালী ছেলে মেয়েদের দল দেখেছি ট্রেকিং এর সরঞ্জাম নিয়ে ধোত্রে আসতে। তারা নাকি ভবিষ্যত পোর্টারের জন্যই এখানে এসে বেসিক ট্রেনিং-এর অভিজ্ঞতা নিয়ে থাকে।

ফুটবল মাঠ, মাঝে মাঝে ঢেকে যায় ঘন মেঘের আড়ালে - ছবি কৃতজ্ঞতাঃ রায়হান
ফুটবল মাঠ, মাঝে মাঝে ঢেকে যায় ঘন মেঘের আড়ালে – ছবি কৃতজ্ঞতাঃ রায়হান

মাঠের পরের রাস্তাটুকুতে আমরা আর পা বাড়ায়নি। ফিরতে পথে আবার হাটা শুরু করেছি। কেননা আজকে আমাদের লামাহাটা হয়ে দার্জেলিং যাবার প্ল্যান। সকাল সাড়ে দশটা নাগাদ রিজার্ভ করা গাড়ি দিদির গেস্ট হাউজের সামনে চলে আসবে, তারপর সেখান থেকে লামাহাটা এবং অতঃপর দার্জেলিং এর পথে এগোনো।

ফিরতে পথে বেশ কিছু ছবি তুলে চলে এলাম দিদির কটেজে। সেখানে কিছুটা সময় রেস্ট নিয়ে সকালের নাস্তা সাড়তে চলে এলাম ছোট্ট একটা দোকানে। এখানে ভেজিটেবল মম এর পাশাপাশি চিকেন মমও পাওয়া যায় যা আমরা গতকাল দুপুরে পাইনি। পেট ভরে মম, চা, বিস্কুট খেয়ে দিদির কটেজ থেকে বিদায় নিয়ে গাড়িতে চড়ে বসলাম। উদ্দেশ্য লামাহাটা।

লামাহাটা যেতে হলে আমাদের প্রথমে মানেভাঞ্জন যেতে হবে। তারপর সেখান থেকে দার্জেলিং-এর পথে বেশ অনেকটা পথ এগিয়ে ঘুম স্টেশনের মোড় থেকে ডান দিকে যেতে হবে। তাই আমাদের ইচ্ছে ছিলো মানেভাঞ্জনে অজয় দাদার গেস্ট হাউজে দুপুরের পেটপূজো সেড়ে নেয়া। কিন্তু অজয় দাদাকে কল দিয়ে জানতে পারলাম উনি ক্রিসমাসের ছুটিতে পরিবার নিয়ে দার্জেলিং বেড়াতে গিয়েছেন। তাই মানেভাঞ্জন আর না থেমে আমরা সরাসরি লামাহাটার উদ্দেশ্যেই রওনা হলাম।

পাহাড়ি এলোমেলো রাস্তা পেরিয়ে, মানেভাঞ্জন হয়ে ট্র্যাফিক জ্যামে আটকে পড়তেই বুঝতে পারলাম আমরা দার্জেলিং শহরের ঘুম স্টেশন এসে গিয়েছি। তবে সেই ট্রাফিক জ্যামে খুব একটা বসে থাকতে হয়নি। মিনিট দশেকের মধ্যেই জ্যাম পেরিয়ে লামাহাটার উদ্দেশ্যে গাড়ি চলছে। লামাহাটা মূলত দার্জেলিং থেকে সিকিম শহরে যাওয়ার পথের প্রথম অংশটাই। লামাহাটা থেকে সিকিম শহরের দূরত্ব চার পাচ ঘন্টা বড়জোর। তবে লামাহাটা থেকে মেঘমুক্ত আকাশে সিকিম শহরটা বেশ ভালোই পরিষ্কার দেখা যায়। দূর থেকে শহর দেখার তেমন কোনো আনন্দ নেই। কেননা দার্জেলিং-এর আশেপাশের সবগুলো শহরই দূর থেকে দেখতে একই রকম।

ধোত্রের মতই লামাহাটা অনেক পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন। তবে এখানে পর্যটক তুলনামূলক বেশী। কেননা এখানে একটা পার্ক রয়েছে। বিশাল পার্ক। পুরো পার্কটিই মূলত একটা পাহাড়ে গা ঘেঁষে বানানো। যদি আমার ভুল না হয় তবে প্রায় ৭০০ মিটার উঁচু পাহাড়ের উপরে রয়েছে একটা প্রাকৃতিক লেক যা আমাদের দেশের বগালেকের কন্সেপ্টের মত। তবে বগালেকের মত এতটা বড় নয় এবং দেখতেও বগালকের মত এতটা প্রাকৃতিক মনে হয়নি। গত কয়েকদিনে আমরা এতটাই প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্যে ডুবে ছিলাম যে, লামাহাটা এসে রিতিমত মাথার চুল ছিড়তে ইচ্ছে করছিলো; কেনো আমরা এখানে এসেছি। সে যাই হোক। যেহেতু এসেই পড়েছি তাই ইচ্ছা না থাকা সত্ত্বেও পার্কটা ঘুরে দেখেছি।

ধোত্রের প্রধান আকর্ষন এই ইকো পার্ক - ছবি কৃতজ্ঞতাঃ জুবায়ের
ধোত্রের প্রধান আকর্ষন এই ইকো পার্ক – ছবি কৃতজ্ঞতাঃ জুবায়ের

লামাহাটাতে কিছুটা সময় কাটিয়ে এইবারের উদ্দেশ্যে দার্জেলিং। লামাহাটা থেকে দার্জেলিং ঘন্টা দেড়েকের পথ। তাই খুব একটা বেগ পোহাতে হয়নি দার্জেলিং আসতে। দার্জেলিং শহরে এসেই গাড়ি ভাড়া চুকিয়ে হোটেল রোজ গার্ডেনে দুইটা রুম বুক করি। রুম বুক করে হালকা ফ্রেশ হয়ে বেড়িয়ে পড়ি দুপুরের খাবারের উদ্দেশ্যে। তবে ততক্ষনে বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা হবার পথে। চলে যাই মল রোডের কেএফসিতে। সেখানে খাওয়া দাওয়া করে মল রোড ধরে এগুতেই দেখা মিলে সান্দাকফুতে পরিচয় হওয়া কলকাতার দাদা-দিদিদের সাথে।

জয়িস পাব কিংবা পুরান দাজুর পানশালা - ছবি কৃতজ্ঞতাঃ জুবায়ের
জয়িস পাব কিংবা পুরান দাজুর পানশালা – ছবি কৃতজ্ঞতাঃ জুবায়ের

বেশ অনেকটা সময় আড্ডা দিয়ে সোজা চলে আসি পুরান দাজুর পানশালা বা অঞ্জন দত্তের সেই বিখ্যাত জয়িস পাবে। যেখানে অঞ্জন দা এবং কবির সুমন তাদের একটা এলবামের জন্য বেশ কিছু গান লিখেছেন। জয়িস পাবে বেশ কিছুটা সময় কাটিয়ে রাতের খাবারের জন্য যখনই বের হলাম তখনই বিধিবাম। বেশীরভাগ খাবারের দোকানই বন্ধ হয়ে গিয়েছে। তাই কোনো উপায় না দেখে একটা বাঙ্গালি ঘরোনার হোটেলে ঢুকে পরোটা আর নানান ধরনের বাঙালি আইটেম ট্রাই করে রাতের ভুড়িভোজ সম্পন্ন করে ফিরে আসি হোটেলে। হোটেলে এসে ফ্রেশ হয়ে বেশ কিছুটা সময় গল্প, আড্ডায় কাটিয়ে দিয়ে পরের দিন প্ল্যান করে ঘুমের রাজ্যে বিচরনের জন্য চোখ বুজলাম।

টিপসঃ ধোত্রে থেকে সাধারনত মানেভাঞ্জনের কোনো গাড়ি পাওয়া যায় না। তবে বুদ্ধি করে মানেভাঞ্জন থেকে ধোত্রে আসার সময় ড্রাইভারের মোবাইল নাম্বার রেখে দিয়ে পরবর্তীতে কন্টাক্ট করে ধোত্রে থেকে মানেভাঞ্জন আসতে হবে। তবে এক্ষেত্রে ধোত্রের হোমস্টে বা যে কটেজগুলো আছে, সেসব কটেজের মালিক/ম্যানেজারের সাথে কথা বলে ব্যবস্থা করা যেতে পারে। তবে এই ব্যাপারে আমি নিশ্চিত নই।
ধোত্রে থেকে মানেভাঞ্জন হয়ে, লামাহাটা ঘুরে, দার্জেলিং আসাটা বেশ সময় সাপেক্ষ এবং কিছুটা অতিরিক্ত টাকা গুনতে হবে এরজন্য। যেমন, ধোত্রে থেকে মানেভাঞ্জন হয়ে লামাহাটা ঘুরে দার্জেলিং আসতে আমাদের প্রায় ২৫০০-৩০০০ রুপী দিতে রিজার্ভ সুমোর ভাড়া দিতে হয়েছিলো। ব্যক্তিগতভাবে আমি লামাহাটা যাওয়াকে সাপোর্ট করছি না। কেননা সেখানে দেখার মত কিছুই আমার চোখে পড়েনি।
দার্জেলিং শহর মানেভাঞ্জন বা ধোত্রের মত এতটা পরিষ্কার বা শান্ত নয়। কেননা এখানেই মূলত পর্যটকরা বেশী বেড়াতে আসেন। তাই এদিকে নানান ধরনের, নানান সুবিধা সম্পন্ন হোটেল রয়েছে। বাজেট অনুযায়ী দামাদামি করে পছন্দের হোটেলে উঠাই ভালো। দার্জেলিং শহরে বেশ দালাল রয়েছে, যারা ট্যুরিস্টদের পিছনে ঘুরে নানান হোটেলে নিয়ে যেতে যায়। এইক্ষেত্রে কোনো দালালের খপ্পরে না পড়লে কমের মধ্যে (১০০০-১৫০০ রুপী) ভালো হোটেল পাওয়া সম্ভব।