আজ বেশ সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠতে হয়েছে। কেননা পরিকল্পনা মাফিক আজকে দার্জেলিং এর বেশ কিছু পর্যটক স্পট ঘুরে দেখবো। গতকাল হোটেল থেকেই টাটা সুমো রিজার্ভ করে নিয়ে কি কি স্পট ঘুরে দেখবো তা জানিয়ে রাখি। সেই অনুযায়ী সকাল আটটার মধ্যেই গাড়ি চলে আসবে হোটেলের সামনে। তাই আমরা তড়িঘড়ি করে আটটার মধ্যেই তৈরী হয়ে যাই। সময়মত গাড়িতে উঠে প্রথমেই আমরা চলে দার্জেলিং এর অন্যতম সেরা আকর্ষন রোপওয়েতে। সকাল নয়টার মধ্যে পৌছালেও রোপওয়ের কাউন্টার খুলে সকাল সাড়ে নয়টা নাগাদ। তাই একদম আগে যাওয়াটাই সবথেকে ভালো সিদ্ধান্ত। তাহলে রোপওয়েতে উঠার সিরিয়ালে দাঁড়িয়ে থেকে অযথা সময় নষ্ট হয় না।

বন্ধুত্ব হাত বন্ধনী - ছবি কৃতজ্ঞতাঃ জুবায়ের
বন্ধুত্ব হাত বন্ধনী – ছবি কৃতজ্ঞতাঃ জুবায়ের

আমরা কাউন্টার খোলার আধঘন্টা আগে চলে যাওয়ায় প্রথমেই সিরিয়াল পেয়ে যাই। যেহেতু সকালে নাস্তা করে বের হইনি তাই, কাউন্টার খোলা অবদি সময়টুকুতে চাওমিন, চিকেন মোমো, ব্রেড-এগ মামলেট দিয়ে সকালের নাস্তা সেড়ে নেই।

রোপওয়ে দার্জেলিং এর অন্যতম সেরা আকর্ষন হওয়া সত্ত্বেও, এখানের ক্যাবল কারে চরার কিছুক্ষনের মধ্যেই ঝিমুনি ধরে যায়। অন্তত আমার সেটা হয়েছে। অনেকের সেটা হতেও না পারে। প্রায় ৪০ মিনিট আপ-ডাউন জার্নিতে বেশ অনেকটা উঁচু থেকে দার্জেলিং শহর, বিশাল বিশাল চা বাগান, কাঞ্চনজঙ্ঘা এবং রাম্মান নদীর দেখা মিলবে। সব মিলিয়ে এক ধরনের মিশ্র অভিজ্ঞতা।

রোপওয়ে থেকে দার্জেলিং-এর পাহাড় - ছবি কৃতজ্ঞতাঃ হাসান
রোপওয়ে থেকে দার্জেলিং-এর পাহাড় – ছবি কৃতজ্ঞতাঃ হাসান
রোপওয়ে থেকে দার্জেলিং-এর চা বাগান - ছবি কৃতজ্ঞতাঃ রায়হান
রোপওয়ে থেকে দার্জেলিং-এর চা বাগান – ছবি কৃতজ্ঞতাঃ রায়হান

রোপওয়ে ঘুরে আমরা সোজা চলে যাই দার্জেলিং এর সবচেয়ে বড় আকর্ষন চিড়িয়াখানায়। ব্যক্তিগতভাবে দার্জেলিং-এ আমি যতগুলো পর্যটক স্পট ঘুরে দেখেছি এর মধ্যে চিড়িয়াখানা সবথেকে আকর্ষনীয় মনে হয়েছে আমার কাছে। দার্জেলিং এর এই চিড়িয়াখানাটি ছোট্ট একটি পাহাড়ের উপর। এর ভেতরকার পরিবেশও বেশ অসাধারন। অনেক অচেনা, অদেখা প্রানীর দেখা মিলবে এখানে। তবে যে প্রানীটির আকর্ষন এখানে সবচেয়ে বেশী তা হলো রেড পান্ডা বা এলুরোস ফুলজেনস। অনেক ক্ষেত্রে একে আবার ছোট্ট বিড়াল রুপী ভাল্লুক বিশেষনেও বিশেষায়িত করা হয়। বিলুপ্ত প্রায় এই প্রানীটিই, এই চিড়িয়াখানার অন্যতম সেরা আকর্ষন।

বিলুপ্ত প্রজাতির লাল পান্ডা - ছবি কৃতজ্ঞতাঃ রায়হান
বিলুপ্ত প্রজাতির লাল পান্ডা – ছবি কৃতজ্ঞতাঃ রায়হান

দার্জেলিং এর এই চিড়িয়াখানাটি মূলত পদ্মজা নাইডু হিমালয়ান চিড়িয়াখানা নামে পরিচিত। কেননা এর ভেতরেই হিমালয়ান মাউন্টেইনারিং ইন্সটিউট অবস্থিত। হিমালয়ান পর্বতমালার বিভিন্ন শৃঙ্গ ও তার আরোহন সম্পর্কিত নানান ধরনের তথ্য বহুল এই ইন্সটিউট একটি চমৎকার মাধ্যম হিসেবে কাজ করছে।

তেনজিং স্মারক - ছবি কৃতজ্ঞতাঃ রায়হান
তেনজিং স্মারক – ছবি কৃতজ্ঞতাঃ রায়হান

চিড়িয়াখানা এবং মাউন্টেইনারিং ইন্সটিউটে বেশ অনেকটা সময় নিয়ে ঘুরে; সোজা চলে যাই তেনজিং রক যে স্থানে অবস্থিত সেখানটায়। মূলত এটি হচ্ছে বিশাল এক জোড়া প্রাকৃতিক পাথর, যেখানে ট্যুরিস্টরা মূলত রক ক্লাইম্বিং করতে আসেন। খুব একটা সময় না কাটিয়ে গুটি কয়েক ছবি তুলেই রওনা দেই জাপানীজ টেম্পল ও পিস প্যাগোডার উদ্দেশ্যে।

তেনজিং রক - ছবি কৃতজ্ঞতাঃ হাসান
তেনজিং রক – ছবি কৃতজ্ঞতাঃ হাসান

চিড়িয়াখানার পর যেই স্থানটি সবচেয়ে বেশী আকর্ষনীয় মনে হয়েছে; সেটি হলো এই জাপানীজ টেম্পল ও পিস প্যাগোডা। মূলত বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের একটি পবিত্র স্থান। জাপানীজ টেম্পল এবং পিস প্যাগোডা দুটি আলাদা স্থাপত্য হলেও এদের অবস্থান পাশাপাশি। জাপানীজ টেম্পলটি Nipponzan Myohoji Buddhist Temple নামেও পরিচিত। পিস প্যাগোডা ঠিক এর পাশেই অবস্থিত। পিস প্যাগোডার সবচেয়ে বড় আকর্ষণ হলো গৌতম বুদ্ধের চার ধরনের রূপের এক কারুকার্য করা আছে পিস প্যাগোডার উপরিভাগে।

জাপানীজ টেম্পেলের পূজা আর্চনার স্থান - ছবি কৃতজ্ঞতাঃ জুবায়ের
জাপানীজ টেম্পেলের পূজা আর্চনার স্থান – ছবি কৃতজ্ঞতাঃ জুবায়ের
পিস প্যাগোডা - ছবি কৃতজ্ঞতাঃ তানজির
পিস প্যাগোডা – ছবি কৃতজ্ঞতাঃ তানজির

আমাদের দার্জেলিং-এ ঘুরার তালিকায় সেন্ট পলস স্কুল ছিলো না। তবে ড্রাইভারকে অনেক রিকুয়েস্ট এবং কিছু বকশিসের বিনিময়ে আমরা রাজি করাই সেন্ট পলস স্কুলে নিয়ে যাওয়ার। সেন্ট পলস স্কুলটি মূলত জনপ্রিয় হিন্দী সিনেমা ম্যা হু না-এর শুটিং স্পট ছিলো। সেই থেকে একটা আকর্ষন কাজ করে অনেকের মধ্যে এই স্কুলটি ঘুরে দেখার। তবে বেসরকারী কিংবা ব্যক্তি মালিকাধীন প্রতিষ্ঠান হওয়ার কারণে আমরা স্কুলের ভিতরে প্রবেশ করতে পারিনি। মেইন গেটে সামান্য ভেতর থেকেই ফিরে আসতে হয়েছিলো।

সেন্ট পলস স্কুলের একাংশ - ছবি কৃতজ্ঞতাঃ রায়হান
সেন্ট পলস স্কুলের একাংশ – ছবি কৃতজ্ঞতাঃ রায়হান
সেন্ট পলস স্কুলে প্রধান ক্যাম্পাসে ঢুকার পথ - ছবি কৃতজ্ঞতাঃ হাসান
সেন্ট পলস স্কুলে প্রধান ক্যাম্পাসে ঢুকার পথ – ছবি কৃতজ্ঞতাঃ হাসান

সেন্ট পলস স্কুলের মেইন গেট থেকে আমরা দার্জেলিং অন্যতম আকর্ষন রক গার্ডেনের উদ্দেশ্যে রওনা হই। মূলত এটিই আমাদের ঘুরার তালিকায় সর্বশেষ স্পট। রক গার্ডেন দার্জেলিং শহর থেকে বেশ ভালোই দূরে এবং বেশ নিচেও। রক গার্ডেন মূলত একটি পাহাড় ও ঝর্না ঘেরা কৃত্রিম পার্ক। পর্যটকদের বেশী আকর্ষনের জায়গা হওয়ার দরুন দার্জেলিং এর অন্যান্য পর্যটক স্পট থেকে এটি বেশ অপরিষ্কার এবং অপরিচ্ছন্ন। সারাদিন দৌড়ের উপর এক পর্যটক স্পট থেকে অন্য পর্যটক স্পট ঘুরে দুপুরে খাবারের কথাই বেমালুম ভুলে গিয়েছিলাম। রক গার্ডন এরিয়াতে ছোটখাটো কিছু খাবারের দোকান রয়েছে। সেখান থেকে হালকা কিছু পেট পুজোয় উতসর্গ করে কিছুটা সময় রক গার্ডেন স্পটে কাটিয়ে হোটেলের উদ্দেশ্যে রওনা হই।

হোটেলে পৌছাতে পৌছাতে ততক্ষনে বিকেল গড়িয়ে প্রায় সন্ধ্যা। হালকা ফ্রেশ হয়েই বেরিয়ে পড়ি বিগ বাজার এবং চক বাজার এলাকায় হালকা কেনাকাটার উদ্দেশ্যে। তবে খুব একটা সময় নিয়ে কেনাকাটা করা হয়নি। কেননা আজ রাতে কলকাতা দাদা-দিদিদের সাথে একসাথে ডিনারের প্ল্যান রয়েছে। তাই সীমিত কেনাকাটা করে হোটেলে ব্যাগ ট্যাগ রেখেই চলে যাই ডিনারে। ডিনার শেষ করে হালকা আড্ডা গল্প করে হোটেলে ফিরতে ফিরতে রাত প্রায় এগারটা।

আজকেই আমাদের দার্জেলিং-এ শেষ রাত এবং কাল সকালে দেশের উদ্দেশ্যে রওনা হওয়ার কথা থাকলেও সবার সম্মতিক্রমে আমরা আরো একটা দিন দার্জেলিং-এ কাটানোর জন্য সিদ্ধান্ত নেই। তাই পরদিনের হালকা প্ল্যান করে, খানিকটা আড্ডাবাজি গল্প শেষ করে ঘুমের উদ্দেশ্যে সবাই শুয়ে পড়ি।

টিপসঃ দার্জেলিং এর আকর্ষনীয় পর্যটক স্পটগুলো ঘুরে দেখার জন্য হোটেল থেকেই নানান ধরনের গাড়ির প্যাকেজ রয়েছে। এছাড়া রয়েছে নানান ধরনের ট্রাভেল এজেন্সী। এর বাইরেও, লোকাল মানুষ/ড্রাইভারের সাথে কথা বলে ভাড়ায় গাড়ি ঠিক করা সম্ভব। স্থান, সময় এবং গাড়ির সিটের সংখ্যার উপর ভিত্তি করে ভাড়া কম বেশী হতে পারে। আমরা যে গাড়িটি রিজার্ভ করেছিলাম সেটি সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত আমাদের উপরের প্রায় সবগুলো স্থান ঘুরিয়ে দেখিয়েছে এবং টোটাল সিট ছিলো আট। সেই হিসেবে ভাড়া পরেছিল ২০০০ রুপীর মত। অফ সিজন এবং দামাদামী করে ভাড়া আরো কমানো সম্ভব।
আমরা দার্জেলিং এর অন্যতম বেশ কয়েকটি আকর্ষন যেমনঃ টাইগার হিল, বাতাসিয়া লুপ, ঘুম স্টেশন এসব প্লেসে যায় নি। বাতাসিয়া লুপ এবং ঘুম স্টেশন দার্জেলিং ঢুকার পথেই পড়বে, সো সে সময় ঘুরে নেয়া সম্ভব। বাতাসিয়া লুপ এবং ঘুম স্টেশন অতটা আকর্ষনীয় না হলেও টাইগার হিল বেশ আকর্ষনীয় স্থান। সাধারন খুব ভোরের দিকে সূর্য উঠার আগেই ট্যুরিস্টরা চেষ্টা করে টাইগার হিলে চলে যাওয়ার। সেখান থেকে কাঞ্চনজঙ্ঘার বেশ ভালো একটা ভিউ পাওয়া যায়। যেহেতু আমরা সান্দাকফু ঘুরে আসছি তাই টাইগার হিল যাওয়ার প্রয়োজন মনে করিনি।
দার্জেলিং-এ শপিং এর জন্য বিগ বাজার ভালো অপশন। তবে কম টাকা এবং ভালো দামাদামি করতে পারলে চক বাজারে গিয়ে শপিং করাটা সাশ্রয়ী হবে তুলনামূলক।