আজ ক্রিসমাস বা বড়দিন। দার্জেলিং-এ আজকের দিনটা আমাদের জন্য অন্যরকম। পুরো রিল্যাক্স-রিফ্রেশমেন্টের একটা দিন। ঘুম থেকেও উঠেছি কিছুটা দেরিতেই। উঠতে উঠতে প্রায় সকাল আটটা। আলসেমী করে তৈরী হয়ে হেটে হেটে দার্জিলিং ক্লক টাওয়ার ঘুরে খাড়া রাস্তা বেয়েই চলে এলাম বিখ্যাত রেস্তোরা কেভেন্টারসে। এই রেস্তোরার সকালের নাস্তা বেশ মজাদার; এখানে বাহারী রকমের ইংলিশ ব্রেকফাস্ট পাওয়া যায়। তাছাড়া রেস্তোরার ছাদে বসে কাঞ্চনজঙ্গার বেশ সুন্দর একটা ভিউ পাওয়া যায়, যা দার্জেলিং এর অন্য কোনো রেস্তোরা থেকে দেখা মেলে না। শুনেছি, বিখ্যাত চলচিত্র নির্মাতা সত্যজিত রায় তার অন্যতম সেরা চলচিত্র কাঞ্চনজঙ্ঘার শুটিং এর কিছু অংশ এখানে করেছিলেন।

খুব পুরোনো এবং হাইপ তোলা রেস্তোরা হওয়ার দরুন ঢুকতেই বাধার সম্মুখীন। অনেকটা বড় লাইন হয়ে গিয়েছে ইতোমধ্যে। ভিতরে খালি না হওয়া পর্যন্ত বাইরের কাউকে ঢুকতে দিবে না। আসলে আমরা যেই সময়টায় দার্জেলিং ঘুরতে গিয়েছি এই সময়টায় অনেক পর্যটক আসেন বেড়াতে। তাই প্রায় সব রেস্তোরাতেই এরকম লাইন দেখা যায়। তবে আমরা নাছোড়বান্দা। এইখানেই সকালের নাস্তা করবোই। প্রায় মিনিট চল্লিশেকের মত লাইনে দাঁড়িয়ে অবশেষে ঢুকতে পারলাম আর ঢুকেই একদম ছাদে গিয়ে বসলাম। আবহাওয়া ভালো হওয়ায় কাঞ্চনজঙ্ঘার চূড়াটা বেশ পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে। কিছুক্ষন বসার পর বুঝলাম, আজকের এই আলসেমী শুধু আমাদের একার নয়; এই রেস্তোরায় কাজ করা প্রতিটি ওয়েটারেরও। এক মেন্যু দিয়ে গিয়ে অর্ডার নেয়ার কোনো নাম গন্ধ নেই। বেশ অনেকটা সময় পর অর্ডার নিয়ে গেলেও তুলনামূলক কম সময়ের মধ্যেই খাবার সার্ভ করে দেয়। খাবারের টেস্ট বেশ ভালো। এইধরনের ইংলিশ ব্রেকফাস্টের অভিজ্ঞতা শুধু সিনেমায় দেখা পর্যন্তই ছিলো, এবার সেটা পূরন হলো।

বিখ্যাত কেভেন্টারস রেস্তোরার প্রবেশ পথ - ছবি কৃতজ্ঞতাঃ হাসান
বিখ্যাত কেভেন্টারস রেস্তোরার প্রবেশ পথ – ছবি কৃতজ্ঞতাঃ হাসান

অনেক আয়েশ ও সময় নিয়ে সকালের নাস্তার পর্ব চুকিয়ে বেরিয়ে পড়লাম বিগ বাজার আর চক বাজারের অলিগলিতে হালকা কেনাকাটার উদ্দেশ্যে। হালকা কেনাকাটার ফাঁকে ইনোক্স সিনেমা হলের টিকিটও কেটে ফেলি সিনেমা দেখার উদ্দেশ্যে। দুপুরের শো, তাও আবার থ্রিডি। জুমানজি মুভির একদম নতুন পার্ট – জুমানজি দ্যা নেক্সট লেভেল।

বিভিন্ন ট্রাভেল গ্রুপে ইন্ডিয়ার ইনোক্স সিনেমা হলের বেশ নামধাম শুনেছি। এর আগে কলকাতায় গিয়ে যেহেতু অভিজ্ঞতা নেয়া হয়নি তাই দার্জেলিং এসে সেটা মিস করা মোটেও ঠিক হবে না। তাই আর কালক্ষেপন না করে টিকিট করেই ফেলি। কিন্তু সিনেমা হলে ঢুকতেই চোখ ছানাবড়া। খুবই অপরিষ্কার এবং সংস্কারের বড়ই অভাব এই ইনোক্স সিমেমা হলে। তার উপর নিম্নমানের স্ক্রিন ও থ্রিডি গ্লাস। হয়তো দার্জেলিং দেখে হলের এই অবস্থা, এটা ভেবে নিয়েই সিনেমা দেখা শুরু করি।

সিনেমা দেখা শেষ করে, সোজা চলে আসলাম মার্কেটের দোতলায়। সেখানে আবার ডমিনোজ পিজ্জা শপ রয়েছে। যেহেতু আজকের দিনটা আমাদের পুরোটাই রিল্যাক্স-রিফ্রেশমেন্টের জন্য বরাদ্ধ; তাই যা করতে বা খেতে মন চাচ্ছে তাই করছি। যদিও ততক্ষনে দুপুর গড়িয়ে বিকেলের দিকে হাটছে সময় তারপরেও লাঞ্চ যেহেতু করা হয়নি, তাই লাঞ্চ হিসেবে ডমিনোজের পিজ্জা খেয়ে এবং আরো কিছু কেনাকাটা করে মল থেকে বেরিয়ে সোজা হোটেলে।

ক্রিসমাস ইভে দার্জেলিং-এর মল রোডের একাংশ - ছবি কৃতজ্ঞতাঃ হাসান
ক্রিসমাস ইভে দার্জেলিং-এর মল রোডের একাংশ – ছবি কৃতজ্ঞতাঃ হাসান
চৌরাস্তার উৎসব মুখর পরিবেশ - ছবি কৃতজ্ঞতাঃ হাসান
চৌরাস্তার উৎসব মুখর পরিবেশ – ছবি কৃতজ্ঞতাঃ হাসান

হোটেলে গিয়ে ফ্রেশ হয়ে সন্ধ্যা নাগাদ আবার বের হলাম ক্রিসমাস ইভের আয়োজন দেখার জন্য। ক্রিসমাসের কারণে দার্জেলিং-এ পর্যটক কিছুটা বেশী এবং নানান ধরনের জমকালো বাতির আয়োজন চারিদিকে। হাটতে হাটতে চলে গেলাম একটা চার্চে। সুন্দর করে আলোকসজ্জায় সজ্জিত। কিন্তু সেখানে কোনো প্রোগ্রাম হচ্ছিলো না। হয়তো হয়েছিলো বেশ খানিকটা আগে।

ক্রিসমাস উপলক্ষে আলোকসজ্জায় সজ্জিত চার্চ - ছবি কৃতজ্ঞতাঃ তানজীর
ক্রিসমাস উপলক্ষে আলোকসজ্জায় সজ্জিত চার্চ – ছবি কৃতজ্ঞতাঃ তানজীর

বেশ কিছুটা সময় মল রোড, চৌরাস্তা ঘুরে ডিনারের জন্য চলে এলাম দার্জেলিং-এর অন্যতম সুন্দর রেস্তোরা পিস-এ। তবে এর জন্য ঘন্টা তিনেক আগে থেকেই বুকিং করতে হয়েছিলো আমাদের। পিস-এর লাইভ মিউজিকের সাথে ডিনার আর আড্ডা সেড়ে আলসেমী আর মন খারাপের ভঙ্গিমায় হোটেলের দিকে পা বাড়ালাম। কেননা আজই আমাদের শেষ দিন। কালই দেশের উদ্দেশ্যে রওনা হতে হবে। আর একটা দিন পর থেকেই প্রতিদিনকার ব্যস্ততা শুরু। সেই যান্ত্রিক জীবন।

পিস রেস্তোরার লাইভ মিউজিক - ছবি কৃতজ্ঞতাঃ হাসান
পিস রেস্তোরার লাইভ মিউজিক – ছবি কৃতজ্ঞতাঃ হাসান
পিস রেস্তোরার বেলকনি - ছবি কৃতজ্ঞতাঃ হাসান
পিস রেস্তোরার বেলকনি – ছবি কৃতজ্ঞতাঃ হাসান

দেশে ফেরার গল্পঃ
পরদিন ঘুম থেকে উঠে, কাছেই একটা হোটেল থেকে নাস্তা সেড়ে নেই। রাতে গুছিয়ে রাখা ব্যাকপ্যাক নিয়ে হোটেলের ভাড়া চুকিয়ে, রিজার্ভ করা সুমোতে করে রওনা হই শিলিগুড়ির উদ্দেশ্যে। দার্জেলিং থেকে শিলিগুড়ি প্রায় ঘন্টা তিনেকের পথ। পাহাড়ি এলোমেলো, উঁচু নিচু পথ পেরিয়ে, মাঝে একবার নাস্তার বিরতি দিয়ে দুপুরের মধ্যেই চলে আসি শিলিগুড়ি শহরে। শহরে নেমেই কেনাকাটার শেষ পর্ব সেড়ে দুপুরের খাবার খেয়েই দুটো অটো রিজার্ভ করে রওনা হই ফুলবাড়ি ইমিগ্রেশনের উদ্দেশ্যে। বিকেল পাচটার মধ্যেই দুইপাশের ইমিগ্রেশন শেষ হয়ে। বাংলাবান্ধা ইমিগ্রেশন অফিসের সামনে থেকে রিজার্ভ মাইক্রো নিয়ে সন্ধ্যা সাতটার মধ্যেই পৌঁছে যাই পঞ্চগড় শহরে। সেখানে হালকা নাস্তা সেড়ে, রাতের বাসে করেই ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা হলাম।

চার চাকার এই বাহন নিজ গন্তব্যের দিকে এগুচ্ছে। নিজ ঘর, আপনজনের কাছে। একটু পিছনের সময়টায় রোমন্থন করলে কল্পনায় ভেসে উঠছে, গত কয়েকদিনে নানান ধরনের হাসি-আনন্দের স্মৃতি। নিজের আত্ম উপলব্ধিগুলো যেনো বারবার ডাকছে ফিরে যেতে। ঘর সংসার, প্রিয়জন, সব ছেড়ে নতুন কোনো শহরে। যেখানে আমার যান্ত্রিকতা মানেই প্রকৃতি নিয়ে বেঁচে থাকা, যেখানে জীবনের শুরুটা হাজারো অচেনা মানুষের মাঝে একদম নতুন করে।

টিপসঃ দার্জেলিং-এ আসলে অবশ্যই কেভেন্টারসে সকালের নাস্তা এবং পিস রেস্তোরায় একবেলা খাওয়া উচিত। কারণ এটা লাইফ টাইম এক্সপেরিয়েন্স হয়ে থাকবে। ইনোক্স সিনেমা হলে দুরাবস্তা জানলে, আমরা ইনোক্স সিনেমা হলে সিনেমা দেখতামই না।
রিফ্রেশমেন্টের জন্য একটা দিন হোটেলের আশপাশের এলাকা ঘুরতে পারলে বেশ এনজয় করা যায় দিনটাকে।  ব্যক্তিগতভাবে দার্জেলিং এর মল রোড এবং চৌরাস্তা এলাকা দুটি আমার কাছে বেশ ভালো লেগেছে। এই দুইটা প্লেসে আসলে পুরো দার্জেলিং সম্পর্কে অন্যরকম একটা ধারনা পাওয়া যায়।
কেনাকাটার জন্য দার্জেলিং মোটেও ভালো জায়গা নয়। সবকিছুর দামই বেশী মনে হয়েছে। তাই কেনাকাটা করতে চাইলে শিলিগুড়ি শহরের বিধান মার্কেট এবং হংকং মার্কেট বেশ ভালো জায়গা। এই দুটো জায়গায় পাইকারি মূল্যে অনেক কিছুই পাওয়া যায় স্পেশালি চকলেটস।