এই বছর ২৬ শে মার্চের ছুটিতে প্ল্যান ছিলো সোনাদিয়া ঘুরে আসার কিন্তু তার আগেই মহামারি কোভিড-১৯ স্থবির করে দেয় পুরো বিশ্বকে। সকল প্ল্যান প্রোগ্রাম, জীবনের আয়োজন যেনো থেমে যায় মূহুর্তেই। অনিশ্চিত হয়ে পরে জীবন ও ভবিষ্যৎ। তবে মহামারী এখনো শেষ হয়নি। চলছে, কিছুটা স্তিমিত হচ্ছে আবার চলছে আর এই প্রতিদিনকার জীবন নিয়েই নিউ নরমাল শব্দের উৎপত্তি হয়েছে।

দীর্ঘ প্রায় তিন মাসের লক ডাউন শেষে যখন নিউ নরমাল জীবনের শুরু হয়েছে, তখন এই ঘর ছেড়ে বাহিরের প্রতি মন যেনো হায় হুতাশ করছিলো। তাই গত মাসেই তিন বন্ধু মিলে চলে গেলাম প্রকৃতির কাছের এক বিচ্ছিন্ন দ্বীপ সোনাদিয়া। ২০১৬ সালের পানিপথে দ্বীপ উপকূল ঘুরার প্ল্যানেও সোনাদিয়া থাকলেও কোনো এক অজানা কারণে সেখানে যাওয়া হয়নি। দূর থেকে হাতছানি দেয়া এই দ্বীপ যেনো চার বছর পরও টানছিলো খুব।

সেপ্টেম্বরের কোনো এক বৃহস্পতিবারের রাতে ঢাকা থেকে ইউনিক নন-এসি বাসে চড়ে রওনা হই সোনাদিয়ার উদ্দেশ্যে। বিচ্ছিন্ন এই দ্বীপে যেতে হলে বেশ ভালোই বেগ পেতে হয় তা আসলে না গেলে বুঝা কষ্টসাধ্য বটে। ঢাকা থেকে রাত সাড়ে এগারটার বাসে কক্সবাজারের উদ্দেশ্যে রওনা হয়ে, সকাল সাড়ে আটটার মধ্যেই পৌঁছে যাই কক্সবাজার। যেখানে পৌঁছে বিখ্যাত পৌষী রেস্তোরায় ভরপেট নাস্তা সেড়ে এবারের উদ্দেশ্যে কক্সবাজার বোট ঘাট। পৌষী রেস্তোরা থেকে বোট ঘাট মিনিট বিশেকের হাটার রাস্তা। মহামারীর এই যুগে স্বাস্থ্য সচেতনায় তাই খাওয়ার পর একটু হাটাচলাই ভালো, তাই ভেবে হেটেই চলে গেলাম বোট ঘাটে। বাংলাদেশের নাগরিক হওয়া স্বত্তেও, স্থানীয় না হওয়ার দরুন ঘাটে ঢুকতেও গুনতে হলো জনপ্রতি ২০ টাকা ঘাট ফি। কোন উদ্দেশ্যে, কি কারণে এই ফি দিতে হয় তা আজ অবদি কেউ জানেন না। জানার হয়তো আগ্রহও নেই কারো।

৬ নং ঘাট, কক্সবাজার । ছবিঃ সাহিদ
৬ নং ঘাট, কক্সবাজার । ছবিঃ সাহিদ

তবে বোটঘাটে ঢুকে মনে হলো জাহান্নামের কোনো একটা প্রশাখা এটি। কোনো সিস্টেম নাই, কোনো তদারকি নাই, যে যেভাবে পারছে যা মন চাইছে তাই করছে। অনেক ধইর্য্যের পরীক্ষা দিয়ে, নানা কাহিনী করে, পাক্কা দেড় ঘন্টা পর একটা স্পিড বোটে উঠে পড়লাম তিনজন।  মহেশখালির চ্যানেল ধরে স্পিড বোট ছুটে চলছে। ভেপসা একটা বাতাস গায়ে লাগছে। আর মাথার উপরের ৯০ ডিগ্রী কোনের সূর্য্যটা যেনো আরো অশান্তি বাড়াচ্ছে। তবে মন শান্ত এইভেবে, অবশেষে আমরা স্পিড বোটে উঠতে পেরেছি।

প্রায় চল্লিশ মিনিট পর পৌঁছে গেলাম মহেশখালি মন্দির ঘাটে। ঘাট থেকে নেমেই দেরি না করে একটা অটো নিয়ে যাত্রা শুরু করলাম ঘটিভাঙ্গা ঘাটের উদ্দেশ্যে। এই ঘটিভাঙ্গা ঘাট থেকেই সোনাদিয়া যাওয়ার ট্রলার ধরতে হবে। ঘটিভাঙ্গা ঘাটে যেতে যেতে আরো প্রায় চল্লিশ মিনিট লেগে গেলো কিন্তু ঘাটে গিয়ে বুঝলাম ভাগ্য আজ সুপ্রসন্ন নয়। এখন ভাটার সময় আর এই সময় সোনাদিয়ার ট্রলার চলাচল করে না। জোয়ারের সময় ট্রলার আসবে এবং আরো দুই তিন ঘন্টার মত অপেক্ষা করতে হবে।

ঘটিভাঙ্গা ঘাট, মহেশখালি । ছবিঃ জুবায়ের
ঘটিভাঙ্গা ঘাট, মহেশখালি । ছবিঃ জুবায়ের

ঘড়িতে সময় দেখলাম মাত্র সাড়ে বারোটা বাজে। জোয়ার আসতে আসতে দুপুর আড়াইটা। সোনাদিয়া যেতে যেতে বিকাল। কিন্তু আগে যেতে পারলে হয়তো ভালো লাগতো। সংখ্যায় কম থাকায় আর বাজেট ইস্যুর কারণে ট্রলার রিজার্ভ করে যে যাবো সেটাও উপায় নেই। কিন্তু পরক্ষনেই একটা লোকাল দলের সাথে চুক্তি করে একটা ট্রলার ঠিক করলাম। ট্রলার আমাদের সোনাদিয়ার পশ্চিম পাড়ায় নামিয়ে দিবে। কিছুটা স্বস্তি মিলছে এইভেবে যে, বিকালের আগেই পৌছাতে পারবো স্বপ্নের সোনাদিয়া।

জোয়ার ছাড়া এই চ্যানেলে কেনো ট্রলার চলে না, তা ট্রলারে উঠার পরই বুঝতে পেরেছি। খুবই কম পানি থাকে, ট্রলার চালানো খুবই কষ্টসাধ্য এই সময়টায়। তাও অনেক ঘটা করে ট্রলার স্টার্ট নিয়েছে। কিন্তু বিধিবাম, কিছুদূর এগুতেই ট্রলারের ইঞ্জিনে সমস্যা দেখা দিলো এবং বাধ্যহয়ে অন্য আরেক ট্রলারে উঠতে হলো। ভাগ্যের এতটাই নির্মম চিত্র সেদিন দেখতে হবে সেটা কল্পনাতেও ছিলো না। দ্বিতীয় ট্রলারও মাঝপথে গিয়ে নষ্ট হয়ে গেলো। এখন আর অন্য কোনো উপায় নেই লোকাল সার্ভিস বোটের অপেক্ষা ছাড়া। মহেশখালি-সোনাদিয়া চ্যানেলে ভাসছি আমরা। একপাশে বঙ্গোপসাগর আর অন্যপাশে ম্যানগ্রোভ ফরেস্ট।

নষ্ট ট্রলারে দুলছে জীবন । ছবিঃ সাহিদ
নষ্ট ট্রলারে দুলছে জীবন, সোনাদিয়া । ছবিঃ সাহিদ

প্রায় ৪০-৫০ মিনিটের মত অপেক্ষার পর দেখা মিললো লোকাল সার্ভিস বোটের। এত দ্রুত এই লোকাল সার্ভিস বোটের দেখা মিলবে কল্পনা করিনি। দুখের পর সুখ আসে ভাব সম্প্রসারনের যথেষ্ট উদাহরন দেয়া যাবে এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে। যে যাক গে, নষ্ট ট্রলার থেকে উঠে পড়লাম সার্ভিস বোটে। এইবার হয়তো সোনাদিয়াই যাওয়া হবে। অশান্ত মন শান্ত হলো কিছুটা। প্রায় ২০ মিনিট পর আমরা পৌঁছে গেলাম সোনাদিয়ার পশ্চিম পাড়ায়। ঘাটে নেমে সোনাদিয়ার সৌন্দর্য্য দেখে মুগ্ধ। আমি বোধহয় এটাই চেয়েছিলাম এতদিন ধরে। একপাশে সবুজ ঝাউবন এবং কচি ঘাসের গালিচা আর অন্যপাশে নিলাভ আকাশ ও জনমানবশূন্য সমুদ্র সৈকত।

সবুজের গালিচা, সোনাদিয়া পশ্চিম পাড়া । ছবিঃ জুবায়ের
সবুজের গালিচা, সোনাদিয়া পশ্চিম পাড়া । ছবিঃ জুবায়ের

আজ রাতে আমাদের সোনাদিয়াতে ক্যাম্পিং করার কথা। সোনাদিয়ার স্থানীয় লোক গিয়াস ভাইয়ের সাথে আগেই আলাপ হয়েছিলো এই ব্যাপারে। খুবই আন্তরিক লোক। দুপুরের খাবারটা উনার বাসাতেই একদম বিশাল গাছের নিচে বসেই আয়োজন করা হয়েছিলো। মেন্যুতে আহামরি তেমন কিছু না থাকলেও যা ছিলো তা দিয়ে সবাই তৃপ্তির ঢেকুর তুলেছিলাম। রাতে বীচ ক্যাম্পিং আর বিশাল বিশাল রুপচাদা মাছের বারবিকিউ হবে। আকাশে চাঁদ থাকলে হয়তো ষোলআনা পূর্ন হতো আজ। তবে হায় কপাল, অমাবশ্যার দিনে চাদের অস্তিত্ব খুজে বেড়ানো যেনো বিশাল অপরাধ।

পুরো বিকেল জুড়ে আমরা সমুদ্র সৈকতে নিজেদের মত করে ঘুরে বেড়িয়েছি। এত সুন্দর প্রকৃতি এখানে, এক মূহুর্তের জন্য চোখ বুজা মানেই হচ্ছে এই বুঝি কিছু হাওয়া হয়ে যাওয়া। আমরা তিনজন মানুষের জন্য দুইটা এবং গাইডের জন্য একটা, মোট তিনটা তাবু পাতানো হয়েছে বীচে। রাতে লোকাল গাইড হিসেবে থাকবেন গিয়াস ভাইয়ের শ্যালক শহিদ ভাই। উনিই আমাদের মাছের বারবিকিউ করে দিবেন আর সাথে ক্যাম্প ফায়ার। পাড়ার ছোট ছোট বাচ্চাদের দিয়ে ৫-৬ টার মত ডাব পেরেছিলাম গাছ থেকে, সেগুলাও আছে সাথে। দীর্ঘ সময় পর খাচা থেকে পালানো পাখির মতই স্বাধীন লাগছিলো সেদিন। মনে হচ্ছিলো আর ফিরবো না ঘরে, মুখোশ খুলে দম নিবো এই নিরব দ্বীপে, যতটা দিন আছি বেঁচে। একটু বেশীই আবেগে ঝরে পড়ছিলো।

নীলাভ আকাশ আর জলরাশি, সোনাদিয়া পশ্চিম পাড়া । ছবিঃ জুবায়ের
নীলাভ আকাশ আর জলরাশি, সোনাদিয়া পশ্চিম পাড়া । ছবিঃ জুবায়ের

রাত আটটার মধ্যেই খাবারের পর্ব চুকিয়ে আড্ডায় মনোনিবেশ করলাম। যেই জোছনার জন্য আফসুস হচ্ছিলো সেটা মূহুর্তেই কেটে গেলো অজস্র তারা আনাগোনা আর খসে পরা তারার মেলা দেখে। আড্ডায় সুর ও সঙ্গীত যেনো এক অনুষঙ্গ হিসেবে ধরা দেয়। সেটাও বাদ রইলো না। অর্নবের খালি গলায় গান, সমুদ্রের মৃদু গর্জন আর ঠান্ডা বাতাস যেনো পুরো পরিবেশটাকে অন্যরকম করে সাজাচ্ছে। রাত বাড়ছে, সঙ্গে নিঃশব্দতাও গভীর হচ্ছে।

রাতের চাঁদ শূন্য আকাশ, সোনাদিয়া পশ্চিম পাড়া । ছবিঃ সাহিদ
রাতের চাঁদ শূন্য আকাশ, সোনাদিয়া পশ্চিম পাড়া । ছবিঃ সাহিদ