রাতভর আড্ডা আর হালকা ঠান্ডায় তাবুতে ঘুমাতে খুব একটা সমস্যা হয়নি। মোটামুটি ভালোই ঘুম হয়েছে সবার। ভোরবেলা ঘুম ভাঙতেই অদ্ভূত এক প্রকৃতিকে দেখলাম। খুব স্নিগ্ধ ও শান্ত একটা সকাল ছিলো। আড়মোড়া ভেঙ্গে তাবু থেকে বের হতেই বিশাল সমুদ্র আর তীরে আচড়ে পড়া মাঝারি আকারের ঢেউ। একদম স্বর্গীয় এক অনুভূতি। ব্যাগ গোছগাছ করে বের হতে হতে প্রায় সকাল সাড়ে ছয়টা বেজে গেলো। সকাল সাড়ে সাতটায় সোনাদিয়া থেকে প্রথম সার্ভিস বোট ছাড়বে। এই বোট মিস করা মানে আরেকটা দিনের জন্য এই সোনাদিয়ায় আটকে যাওয়া। তবে আরেকটা দিন সোনাদিয়া থাকতে পারলে খুব একটা মন্দ হতো না। কিন্ত ব্যস্ত জীবনে সময়টা অনেক নিয়মমাফিক চলে, তাই আমাদের সকালের প্রথম বোটটাই ধরতে হবে।

সকালের সোনাদিয়া। ছবিঃ জুবায়ের
সকালের সোনাদিয়া। ছবিঃ জুবায়ের

এত সকালে নাস্তা করতে ইচ্ছে হচ্ছিলো না, তাই কিছু না খেয়েই উঠে পড়ি বোটে। সাড়ে সাতটায় বোট ছাড়ার টাইম হলেও স্থানীয় লোকজন যাতায়াত করে বলে বোট ছাড়তে ছাড়তে আটটা বেজে গেলো। একদিনের পরিচিত খাল ধরে মহেশখালির ঘটিভাঙ্গা ঘাটের দিকে এগিয়ে চলছে বোট। সমুদ্র উপকূলে রোদ খুব দ্রুতই তাপ ছড়াতে থাকে। এই রৌদ্রজ্জল উত্তাপ নিয়েই প্রায় ৪০ মিনিট পর আমরা পৌঁছে যাই মহেশখালির ঘটিভাঙ্গা ঘাটে। জনপ্রতি ৩০ টাকা ভাড়া মিটিয়ে ঘাট থেকে হেটে হেটে চলে আসি মূল সড়কে। রিজার্ভ অটো নিয়ে একদম সোজা মহেশখালি মন্দিরঘাট। সেখানে হালকা নাস্তা, মহেশখালি বিখ্যাত ডাব খেয়ে চলে যাই জেটি ঘাট যেখান থেকেই মূলত কক্সবাজারের উদ্দেশ্যে লোকাল ট্রলার এবং স্পীড বোট ছাড়ে। লাইন ধরে উঠে পড়লাম স্পীড বোটে। ছোট বড় ঢেউ ভাঙ্গিয়ে দুপুর বারোটা নাগাদ আমরা পৌঁছে যাই কক্সবাজার।

আজকের দিনটা আমাদের একটু রিল্যাক্সভাবে কাটানো দিন। তাই আসার আগে থেকেই ইচ্ছে ছিলো মেরিন ড্রাইভের রোডের আশেপাশের কোনো রিসোর্টে থাকা। তাহলে একদিকে যেমন কোলাহল থেকে দূরে থাকা যাবে অন্যদিকে পাহাড় আর সমুদ্রকে একসাথেই উপভোগ করা যাবে। মেরিন ড্রাইভের রোডের মোটামুটি মানের রিসোর্টগুলোতে আগে থেকে বুকিং না দিলে রুম পাওয়া খুবই ডিফিকাল্ট কিন্তু তারপরেও একটা শেষ চেষ্টা চালানোর জন্য কল দিলাম মুন নেস্ট রিসোর্টে এবং খুবই ভাগ্যক্রমে আমরা একটা রুমও পেয়ে গেলাম, একদম সেদিনের জন্যই। তাই আর দেরি না করে বুক করে ফেললাম।

যেহেতু সকালে খুব একটা নাস্তা করা হয়নি আর এদিকেও দুপুর হয়ে গিয়েছে তাই চিন্তা করলাম একবারে দুপুরের খাবার সেড়েই সোজা রিসোর্টে গিয়ে চিল করবো। তাই কক্সবাজার বোট ঘাট থেকে সরাসরি চলে গেলাম পানশি রিসোর্টে। দুপুরে ভরপেট খেয়ে একটা সিএনজি রিজার্ভ করে চলে আসলাম মুন নেস্টে।

রিসোর্টের জানালা দিয়ে দূরের পাহাড়। ছবিঃ জুবায়ের
রিসোর্টের জানালা দিয়ে দূরের পাহাড়। ছবিঃ জুবায়ের

খুব ছিমছাম একটা পরিবেশ। ছোটখাটো একটা ট্রেইল ধরে হেটে তারপর রিসোর্টে ঢুকতে হয়। কিছুটা এডভেঞ্চারাসও। পুরো রিসোর্ট জুড়ে মাত্র চারটি কটেজ। তবে চারটিই আলাদা। সামনে বিশাল জায়গায় ডাইনিং-এর ব্যবস্থা করা। একটু অন্যরকম তবে সুন্দর এবং গোছানো। আমরা তিন বন্ধু ছাড়া বাকি প্রত্যেকটা কটেজেই কাপলরা বেড়াতে এসেছে। তবে ব্যাপারটা মোটেও আমাদের কাছে উইয়ার্ড নয়।

মুন নেস্ট। ছবিঃ সাহিদ
মুন নেস্ট। ছবিঃ সাহিদ

রিসোর্টে চেক-ইন করে ফ্রেশ হয়ে কিছুক্ষন রেস্ট নিয়ে বিকাল নাগাদ চলে গেলাম সৈকতে। এই রিসোর্ট থেকে সমুদ্র সৈকতে যাওয়ার পথটাও একটু এডভেঞ্চারাস বটে। কিছুটা কাদামাটি পেরিয়েই যেতে হয়। তবে এইদিককার সৈকতে মানুষের সমাগম নেই বললেই চলে। সমুদ্র সৈকত ধরে হাটছে, উদ্দেশ্য হেটে হেটেই সালসা বিচে চলে যাওয়া আর সেখান থেকে হিমছড়ি হয়ে ডিনার করে রিসোর্টে ফেরা।

আলোছায়ার গোধূলি। ছবিঃ সাহিদ
আলোছায়ার গোধূলি। ছবিঃ সাহিদ

ম্যাপে সালসা বিচ খুব একটা দূর না দেখালেও বালুর কারণে হাটতে বেশ বেগ পেতেই হচ্ছে, তবে পুরো জার্নিটা আমরা সবাই উপভোগ করেছি। এদিকের সৈকতে মানুষের আনাগোনা খুব একটা না থাকায়, ভালোই লাল কাকড়ার দেখা মিলে। তবে সোনাদিয়ার সৈকতে লাল কাকড়ার যেই দলকে দেখা যায় তা এখানকার দলের তুলনায় বেশ অনেক।

হঠাত রংধনু। ছবিঃ সাহিদ
হঠাত রংধনু। ছবিঃ সাহিদ

সালসা বীচে যেতে যেতে প্রায় সন্ধ্যা হয়ে গিয়েছে। সেখানে কিছুটা সময় কাটিয়ে চলে এলাম হিমছড়ি। হালকা ঘুরাফেরা আর রাতের ডিনার। এমনিতেই রিসোর্টের রুমরেন্ট আমাদের বাজেট ছুইছুই তাই খরচ কিছুটা কমাতেই হিমছড়িতে ডিনার করা। তাছাড়া ডায়েটের কারণে আর্লি ডিনার আমার অভ্যাসেই পরিনত হয়েছে।হিমছড়ি ঘুরে আর ডিনার করে রাত আটটা নাগাদ রিসোর্টে ফিরে গেলাম। গিয়ে ফ্রেশ হয়ে আড্ডা, গান আর কফির তালে কখন যে রাত ১টা বেজে গেছে সেই খবর কারোই নাই। সবকিছু বাদ দিয়ে ঘুমের প্রিপারেশন নিতে যেই না মাথা এলিয়ে দিলাম বিছানায় অমনিতেই মনে হয় গভীর ঘুমের রাজ্যে সবাই।

রাত-দুপুরে মুননেস্ট রিসোর্ট। ছবিঃ সাহিদ
রাত-দুপুরে মুননেস্ট রিসোর্ট। ছবিঃ সাহিদ

সকালে একটু বেলা করেই ঘুম থেকে উঠেছি। কারন কোনো তাড়া নেই আমাদের। ফ্রেশ হয়ে রিসোর্টের কমপ্লিমেন্টারি ব্রেকফাস্ট দিয়ে পেটপূর্তি করে, ব্যাগ গোছগাছ করে দুপুর বারোটা নাগার বেরিয়ে পড়লাম কলাতলির উদ্দেশ্যে। পথিমধ্যে সালসা বীচে অর্নবের ইচ্ছে হলো পাখির মত উড়ার। আমার অতীত অভিজ্ঞতা এবং অর্নব ব্যাপক ইচ্ছায় সেটা সত্যিই পরিনত হলো আর রচনা হলো অর্নবের প্রথম প্যারাসেইলিং শিরোনাম।

মুননেস্টের কমপ্লিমেন্টারি ব্রেকফাস্ট। ছবিঃ জুবায়ের
মুননেস্টের কমপ্লিমেন্টারি ব্রেকফাস্ট। ছবিঃ জুবায়ের

সালসা বীচ থেকে আবারো সোজা চলে গেলাম হিমছড়ি। সেখানে দুপুরের খাওয়া দাওয়া শেষ করেই অটো নিয়ে সোজা কলাতলি। কলাতলি থেকে হেটে হেটে হাফবেলার জন্য বাজেট ফ্রেন্ডলি হোটেল খুজতে খুজতে চলে এলাম সুগন্ধার কাছাকাছি। অবশেষে একটা হোটেলে উঠলাম হাফবেলার জন্য। হোটেলে ঢুকে ফ্রেশ হয়ে বিকাল নাগাদ বেরিয়ে পড়লাম সুগন্ধার বীচের উদ্দেশ্যে। তবে এই বীচের কোলাহলে আমরা বেশ বিরক্ত। গত দুইদিনে আমরা যেই সৈকতের সান্নিধ্যে ছিলাম সেটার কাছে এই সৈকতের আকাশ-পাতাল ব্যবধান। তারপরেও খানিকটা দূরে গিয়ে একটু নির্জনে বেশ খানিকটা সময় বসে উপভোগ করলাম সমুদ্র। সমুদ্রকে দেখে শেষ করা যায় না। জলের পিপাসার মতই সৌন্দর্য্য এই সমুদ্রের।

সুগন্ধার সী-ফুড সমাচার। ছবিঃ সাহিদ
সুগন্ধার সী-ফুড সমাচার। ছবিঃ সাহিদ

সূর্যাস্তের খানিকটা পড়েই সুগন্ধা বীচ থেকে চলে এলাম সী ফুডের দোকানে। স্কুইড, কাঁকড়া, ব্ল্যাক স্যালমন আর লবস্টারের গ্রীলে গলা ডুবিয়ে খাওয়া দাওয়া করে চলে এলাম হোটেলে। এখন শুধু বাসের অপেক্ষা। আজ রাত নয়টার বাসে ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা হবো আমরা। নিয়ে যাবো সোনাদিয়ায় নীলাভ স্মৃতি, রাতভর আড্ডা-গল্পকথা আর ব্যস্ত জীবনের না পাওয়া শ্লোক।