কেউ যদি কখনো জিজ্ঞেস করে পাহাড় নাকি সমুদ্র? আমি খুব অবাক হই। কেনইবা এখানে পছন্দ আলাদা করে এগিয়ে থাকবে? কেনইবা একজন মানুষ দুটো জিনিসকেই সমানভাবে পছন্দ করতে পারবে না? এর ব্যাখ্যা হয়তো প্রশ্নদাতার কাছে নেই। ঠিক তেমনি এই দুটোর মধ্যে একটিকে এগিয়ে রাখার ইচ্ছাটাও আমার নেই। আমি দুটোই পছন্দ করি, দুরকম ভাবে।

অফিসের কাজে হোক আর ব্যক্তিগত ঘুরাফেরার কারনেই হোক, ২০২০ সালের বেশীরভাগ সময়ই আমার সমুদ্রের সাথে কেটেছে। সমুদ্রের বিশালতার মাঝে আত্মউপলব্ধি ব্যাপারগুলো খুব ক্ষুদ্র মনে হয়। কেনো যেনো এই ক্ষুদ্র ব্যাপারগুলো পাহাড়ের কাছে গেলে অসীম লাগে। পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়ালে মনে হয়, আত্মউপলব্ধিগুলো অনেক বড়, অসীম নীল আকাশের মত যা দৃষ্টি সীমানায় কখনো সমুদ্রকে ছুঁয়ে দেয়।

মায়া অনেক বড় জিনিস। এটা অনেকটা পিছুটানের মত। বারবার টানবেই, ছাড়তে চাইবে না। কিন্তু জীবনে মায়ার বেড়াজালে পরে গেলে কেমন এক স্থবিরতা কাজ করে। তখন ইচ্ছে হয় নতুন কিছু দেখতে, নতুন প্রকৃতির মাঝে হারাতে। তাইতো সমুদ্রের মায়া ত্যাগ করে, পাহাড়ে রাগ ভাঙ্গাতেই ছুটে গেলাম বান্দরবানের গহীনে ঝর্না অভিযানে।

ঢাকা থেকে ৫ই নভেম্বর, ২০২০, রাতের বাসে করে আটজন রওনা হলাম বান্দরবানের অন্যতম সর্বোচ্চ ঝর্না লিলুক/লাংলোক দেখার উদ্দেশ্যে। সিজনাল জলপ্রপাতের মধ্যে এই লাংলোক/লিলুক হচ্ছে সবচেয়ে উঁচু ঝর্না। মারমা ভাষায় লাংলোক অর্থ বাদুড়। এই ঝর্নার কাছাকাছি বাদুড় গুহা থাকায় একে লাংলোক ঝর্না বলে ডাকা হয়। অন্যদিকে এই ঝর্নার পাহাড়ের গায়ে ফিঞ্চ প্রজাতির মত পাখির বাসা থাকার কারণে স্থানীয় আদিবাসীরা একে ফি ফি ক্লে বলেও অভিহিত করেন। অন্যদিকে লিলুক অর্থ ভাবনার পরী। ঝর্নার পানি এত উঁচু থেকে পড়ে দেখে মনে হয় আকাশ থেকে পরী নেমে আসছে বলে একে লিলুক ঝর্নাও বলে। সে যাই হোক ভাবার্থ, সবচেয়ে উঁচু ঝর্না এটাই না হোক এর মর্মার্থ।

স্বভাবতই ট্যুরের রাতের যাত্রাপথে খুব একটা ঘুম হয় না উত্তেজনার কারণে। সে হিসেবে আমাদের কারোই তেমন ঘুম হয়নি রাতে। তাছাড়া নন-এসি বাসের জানালা ঠিকমত না লাগলে ঠান্ডা হাওয়ার দরুন ঘুমানো খুবই কষ্টসাধ্য। হালকা কুয়াশা ভেদ করে গাড়ি ছুটে চলছে পার্বত্য জেলা বান্দরবানের উদ্দেশ্যে। ছুটছে ছুটতে সকাল ৬টার মধ্যে পৌঁছে যাই বান্দরবান শহরে। বাস থেকে নেমে আমাদের গাইড উসাইকে কল দিয়ে জানাই আমাদের চলে আসার কথা। বান্দরবান শহর থেকে চাঁদের গাড়ি ঠিক করে, ডালভাজি, চা আর পরোটা দিয়ে সকালের নাস্তা সেরে রওনা হই থানচির উদ্দেশ্যে।

থানচির পথে
থানচির পথে

বান্দরবান শহর থেকে থানচি প্রায় ৯০+ কিলোমিটার। সমতলের রাস্তা হলে এই পথ পাড়ি দিতে বড়জোর দেড়ঘন্টা লাগার কথা। তবে পাহাড়ি আকা-বাকা রাস্তায় এই পথটুকু পাড়ি দিতে প্রায় আড়াই ঘন্টার মত লাগে। তাছাড়া ওয়াই জংশন এবং বলিপাড়া চেক পোস্টে অতিরিক্ত মিনিট চল্লিশেক সময় তো যাবেই।

পাহাড়ি আঁকাবাঁকা রাস্তা পেরিয়ে দুপুর ১২টা নাগাদ আমরা পৌঁছে যাই থানচি বাজার। শেষ যেবার এখানে এসেছিলাম তখন বাজারটা কিছুটা ভিন্নরকম ছিলো। কিছু একটা হারানোর ইঙ্গিত পাচ্ছিলাম এসে। হয়তো কিছুই হারায়নি, সময় ছাড়া। থানচি বিজিবি চেকপোস্টে নাম এন্ট্রি করে, আলুভর্তা, ডাল এবং মুরগি দিয়ে দুপুরের খাওয়া-দাওয়া সেড়ে নিলাম পাশেরই এক হোটেল থেকে। খাওয়া-দাওয়া শেষে আগে থেকেই রিজার্ভ করে বোটে উঠে পড়লাম তিন্দুর উদ্দেশ্যে। দলে সদস্য আটজন থাকায় দুটো নৌকা নিতে হয়েছিলো আমাদের।

থানচি থেকে তিন্দুর উদ্দেশ্যে যাত্রা
থানচি থেকে তিন্দুর উদ্দেশ্যে যাত্রা

হাতে যতটা সময় নিয়ে যাত্রা শুরু করেছিলাম। ভেবেছিলাম আজকেই হয়তো লিলুক দেখেই রেমাক্রি চলে যেতে পারবো। কিন্তু আমাদের ট্যুরের ট্রলার যাত্রায় ঝামেলা হবে তা হতেই পারে না। প্রথম নৌকাটি সময়মতই চলে গিয়েছিলো তিন্দুতে। তবে আমি যে নৌকায় ছিলাম সেটি ছাড়ার ১০ মিনিটের মাথায় মাঝির নাম্বারে একটি কল আসে। ক্যাম্পের ডেডিকেটেড মাঝি হওয়ার কারণে উনাকে জরুরী একটা কাজে ক্যাম্পে রিপোর্ট করতে হবে সেদিনই। তাই তিনি আমাদের সাথে যেতে পারবেন না। নৌকা ঘুরিয়ে আবার চলে এলাম থানচিতে। উঠে পড়লাম অন্য এক মাঝির নৌকায়। প্রায় ২০-২৫ মিনিট চলার পর এই নৌকাটিরও সমস্যা দেখা দেয়। এবার মাঝি সম্পর্কিত কিছু নয়। ট্রলারের ইঞ্চিনেই সমস্যা। মাঝপথে থেমে আসা-যাওয়া অন্যান্য নৌকাগুলোকে ইঙ্গিত করেও তিন্দু যাওয়ার কোনো ব্যবস্থা করতে পারলো না আমাদের নতুন বোটের মাঝি। পরে মাঝির সাপোর্টে থাকা একজন তিন্দুতে গিয়ে ঘন্টা খানেক পরে আমাদের জন্য অন্য একটা খালি নৌকা নিয়ে আসলো, যেটায় করে অবশেষে আমরা তিন্দু পৌছাতে পারলাম। হাতে সময় নিয়ে থানচিতে এসেও কোনো লাভ হয়নি, বরং বিকেলই হয়ে গেছে তিন্দু পৌছাতে পৌছাতে।

লিলুক ঝর্না দেখে আজ রাতে আমরা তিন্দুতেই থাকবো। তাই তিন্দুতে থাকার ব্যবস্থা করে আমরা চলে গেলাম লিলুক ঝর্না দেখার উদ্দেশ্যে। তিন্দুতে আসলে রেমাক্রির মত থাকার কোনো কটেজ নেই। আদিবাসিদের বাসাতেই থাকতে হয়। তাছাড়া বিজিবি সাধারনত তিন্দুতে সবাইকে থাকার পারমিশন দেয় না সেভাবে বিশেষ কারণ ছাড়া।

তিন্দুতে এই ঘরের দোতলায় আমরা রাত কাটিয়েছি
তিন্দুতে এই ঘরের দোতলায় আমরা রাত কাটিয়েছি

তিন্দু থেকে লিলুকের শুরু ট্রেইলে যেতে প্রায় ২০ মিনিটের বোট জার্নি রয়েছে। নৌকায় করে রওনা হলাম আমরা লিলুকের ট্রেইলের উদ্দেশ্যে। ট্রেইলের শুরুতে নেমে এবার বাকি রাস্তাটা ট্রেকিং করেই এগুতে হবে। শুধুমাত্র একটা পাহাড় উঠে সেটা পেরিয়ে নিচে নামলেই দেখা মিলবে বান্দরবানের সুউচ্চ ঝর্না লিলুক বা লাংলোকের। লিলুকের ট্রেইলটা খুব একটা কঠিন বা বড় ট্রেইল নয়। পূর্বে ট্রেকিং অভিজ্ঞতা আছে এমন কেউ ৪০ মিনিটের মধ্যেই এই ট্রেইল ধরে লিলুক ঝর্নার নিচে পৌঁছে যেতে পারবে। তবে নতুন হলে সেটা কখনোই দেড় ঘন্টা বেশী লাগার কথা নয়।

লিলুকের যাত্রাপথ শুরু এখান থেকেই
লিলুকের যাত্রাপথ শুরু এখান থেকেই

আমাদের টিমে সবার স্ট্যামিনা এক না থাকলেও সবাই প্রায় কম সময়ের মধ্যেই পৌঁছে গেলাম লিলুক ঝর্নায়। যেহেতু আমরা বিকেলের দিকে পৌছেছি তাই সেখানে অন্যান্য অনেক গ্রুপই ছিলো। থানচির খুব কাছাকাছি এবং মোটামুটি ছোট ট্রেইল হওয়ার কারণে অনেকেই এই লিলুক ঝর্না দেখতে আসেন।

প্রায় ৩৯০ ফুট উচু এই ঝর্নাটার ভয়ংকর রূপ দেখা যায় বর্ষাকালে। তখন এই ঝর্নার পানির ফ্লো অনেক বেশী থাকে। তবে এতটা দূর যখন এসেছি তখন এই ঝর্নার পানিতে গা এলিয়ে না দিলে কি হয়? তাই নিভার লীডারশীপে আমিও ওর পিছু পিছু চলে গেলাম ঝর্নায় গা ভেজাতে। লিলুকের ট্রেইলটা যতটাই না সহজ এর পানিতে গা ভেজাতে হলে ঠিক ততটাই চ্যালেঞ্জ নিয়ে সামনে এগুতে হয়। একটু অসাবধান হলেই হাত-পা এমনকি মাথাতেও বেশ ভালো আঘাত লাগার সমূহ সম্ভাবনা আছে। তারপরেও সব চলে গেলাম কিছুটা ঝুঁকি নিয়ে।

লিলুক/লাংলোক ঝর্না
লিলুক/লাংলোক ঝর্না

যেকোনো ঝর্নার সৌন্দর্য্য লুকিয়ে থাকে এর পানিতে গা ভেজানোর মধ্যে। দূর থেকে ঝর্না যতটাই না উপভোগ্য তার থেকে বেশী উপভোগ্য এর জলে। বেশ খানিকটা সময় সেখানে ভিজে টইটুম্বর হয়ে যখন প্রচন্ড ঠান্ডায় গায়ে কাঁপুনি দিচ্ছে তখনই ফেরত আসতে হলো।

লিলুক থেকে তিন্দুতে ফেরার অপেক্ষায় নৌকার মাঝি
লিলুক থেকে তিন্দুতে ফেরার অপেক্ষায় নৌকার মাঝি

লিলুক ঘুরে তিন্দু ফিরতে ফিরতে প্রায় সন্ধ্যা। তিন্দুতে এসেই সাঙ্গুর জলে গোসল সেড়ে চলে গেলাম চায়ের দোকানে। নভেম্বর হওয়া সত্ত্বেও এখানে ভালোই ঠান্ডা পড়েছে। গরম চায়ের চুমুকে ঠান্ডার রেশ কিছুটা কমলেও শরীর খুব একটা সায় দিচ্ছে না। তারপরেও বেশ অনেকটা সময় চায়ের দোকান, নদীর পাড়ের মাচাং-এ আড্ডা দিয়ে ফিরে আসি কারবারির বাসায় যেখানে আজ রাতের আহার এবং আশ্রয় মিলবে আমাদের। ধোঁয়া উঠা গরম ভাত, ডাল আর ডিম ভুনা দিয়ে আজ রাতের আয়োজন। খাওয়া শেষে ঘুমানোর প্রস্তুতিতে সবাই। বেশ ক্লান্তই বলা যায়। গতরাতে ছাড়া ছাড়া ঘুম আর সারাদিনের ঘুরাঘুরির কাছে চোখের পাতা ঘুমকে ছাড় দিতে মোটেও প্রস্তুত নয়।