তিন্দু থেকে লিখিয়াং যেতে হলে হাতে বেশ সময় নিয়েই যেতে হয়। প্রথমত, এই লিখিয়াং যাওয়ার অফিশিয়াল কোনো পারমিশন নাই আর দ্বিতীয়ত, লিখিয়াং-এর ট্রেকিং রুটটা তুলনামূলক কিছুটা কঠিন এবং বেশ কয়েকবার পাহাড়ে উঠতে নামতে হয় যা অনেকের কাছেই কষ্টসাধ্য হয়ে পড়ে। যেহেতু হাতে ভালো সময় নিয়েই আমরা লিখিয়াং-এর উদ্দেশ্যে রওনা হবো, তাই ভোরের দিকে ঘুম থেকে উঠে পড়ি সবাই। হাড় কাঁপানো ঠান্ডার মধ্যে হিম শীতল পানির ঝাপটা মুখে দিতেই ঘুম যেনো এক মূহুর্তে দৌড়ে পালালো।

লিখিয়াং যাওয়ার প্রস্তুতি হিসেবে সকাল সাড়ে ছয়টার দিকে, ব্যাগ গুছিয়ে, দুপুরের খাবার রান্না করে পলিথিনে ভরে রেমাক্রির উদ্দেশ্যে রওনা হলাম। রেমাক্রি পৌঁছে আগে থেকেই ঠিক করে রাখা নাফাখুম কটেজে ব্যাগ রেখে খিচুড়ি আর ডিম ভুনা দিয়ে সেড়ে নিলাম সকালের ভরপেট নাস্তা। নাস্তা শেষ করে খানিকটা এদিক সেদিক হাটাহাটি করে নৌকায় করে রওনা হলাম লিখিয়াং-এর উদ্দেশ্যে। লিখিয়াং যেতে হলে প্রথমে বোটে করে রেমাক্রি থেকে বড় মদকের দিকে ত্রিশ থেকে চল্লিশ মিনিটের পথ পাড়ি দিতে হবে। সেই পথটুকু পাড়ি দিয়েই শুরু হবে মূল ট্রেকিং।

লিখিয়াং-এর উদ্দেশ্যে যাত্রা
লিখিয়াং-এর উদ্দেশ্যে যাত্রা

লিখিয়াং-এর ট্রেকিং রুটে মূলত দুইটা ঝর্না আছে, যা লিখিয়াং ১ এবং লিখিয়াং ২ নামে পরিচিত। ট্রেকিং রুটের প্রথমে এবং সবচেয়ে কাছে যেই ঝর্নাটি সেটি হচ্ছে লিখিয়াং ২ এবং দূরের ও অন্যতম বড় যেই ঝর্নাটি সেটি হচ্ছে লিখিয়াং ১। তবে লিখিয়াং ২ খুব একটা বড় ঝর্না না। খুবই ছোট ক্যাসকেড টাইপের। মিরসরাই রেঞ্জের ছোটখাটো ঝর্নার মতই দেখতে লিখিয়াং ২। লিখিয়াং ১ অনেকটা লিলুকের মত, তবে লিলুকের মত এত বড় না হলেও লিলুকের প্রায় কাছাকাছি উচ্চতার হবে।

বুনো জঙ্গলের পথ ধরেই যেতে হয় লিখিয়াং
বুনো জঙ্গলের পথ ধরেই যেতে হয় লিখিয়াং

লিখিয়াং-এর ট্রেকিং রুটটা তুলনামূলক কিছুটা বড়। দুইটার মত পাহাড় উঠানামা করতে হয় এবং সেই সাথে আছে বিশাল ঝিরি পথ। তবে এই রুটটা অনেকটা বুনো জঙ্গল টাইপে। কেননা এই পথে খুব একটা মানুষজনের আসা-যাওয়া নেই। আমরা যেদিন লিখিয়াং-এর ট্রেকিং রুটে গিয়েছিলাম সেদিন শুধু আমাদের টিমই ছিলো আর কোনো টিমের দেখা মেলেনি। তবে পূর্বে ট্রেকিং-এর অভিজ্ঞতা আছে এমন যে কেউ ৪-৫ ঘন্টার মধ্যেই দুটো ঝর্না ঘুরে রেমাক্রি ফেরত আসতে পারবে। তবে নতুন ট্রেকারদের জন্য কিছুটা সময় লাগলেও লিখিয়াং-এর ট্রেকিং রুটটা তাদের জন্য একটা বেশ ভালো এডভেঞ্চার এবং অভিজ্ঞতার ব্যাপার হবে অবশ্য।

লিখিয়াং ২
লিখিয়াং ২
লিখিয়াং ১
লিখিয়াং ১

আমাদের পুরো ৮ জনের টিমটা তিনটা ভাগে ভাগ হয়ে যায় এই লিখিয়াং ট্রেকে। আমরা প্রথম দল সাড়ে ৮টা কি ৯টা নাগাদ ট্রেকিং শুরু করে, সকাল দশটার মধ্যেই লিখিয়াং ২ ঘুরে ১ -এ চলে যাই এবং সবথেকে শেষে দলটি লিখিয়াং ২ ঘুরে লিখিয়াং ১-এ আসে বেলা সাড়ে এগারটা নাগাদ। সেখানে বেশ কিছুটা সময় কাটিয়ে, পলিথিনে মোড়া ডিম ভুনা, ডাল, ভাত খেয়ে রেমাক্রির উদ্দেশ্যে বেলা সাড়ে বারোটা নাগাদ রওনা হই।

আমাদের হাতে বেশ সময় থাকার কারণে, খুব রিল্যাক্সভাবেই আসার ট্রেকিং-টা করা হয়। উঁচু নিচু আর বুনো পাহাড়ি পথ পাড়ি দিয়ে, বেলা তিনটার দিকে নৌকা করে আমরা চলে যাই রেমাক্রি ক্যাসকেডে। প্রায় চার/পাঁচ বছর পর এই ক্যাসকেডে আসা। শেষবার নাফাখুম, আমিয়াখুম ট্যুরে এই ক্যাসকেডে আসা হয়েছিলো। রেমাক্রির অন্যতম সুন্দর জিনিস এই ক্যাসকেড। তবে যতই বান্দরবানের গহিনে ট্রেকিং-এর নেশায় ধরে যাবে ততই কাছের সুন্দর জিনিসগুলো যেনো আর টানবে না আগের মত। শুধু গহিনের ঝর্না, পাহাড় দেখার জন্যই মন অস্থির হতে থাকবে।

লিখিয়াং থেকে ফেরার পথে
লিখিয়াং থেকে ফেরার পথে

পুরো বিকেলটা ক্যাসকেডে কাটিয়ে চলে যাই কটেজে। সেখানে গিয়ে ফ্রেশ হয়ে বিকেলের নাস্তা সেড়ে শুরু হয় আড্ডাবাজি আর আশেপাশে ঘুরাফেরা। রাত যতই বাড়ছে, কাপের পর কাপ চা গেলা হচ্ছে আর চলছে আড্ডাবাজি। কিছুটা সময়ের জন্য আবার রুমে গিয়ে কার্ড নিয়ে বসা কিংবা গভীর রাতে নৌকায় শুয়ে তারা দেখার কর্মকান্ডও যেনো থেমে নেই। আজই আমাদের ট্যুরের শেষ রাত। পরের রাত তো কাটবে গাড়িতেই, তারপর থেকেই শুরু হবে যান্ত্রিক জীবনযাত্রা।