শেষ রাতের ঘুমটা বেশ গভীর হয়। মাঝে মাঝে মনে হয় এই ঘুমটা যেনো আর না ভাঙ্গে। অনন্তকাল ধরে পরে থাকবো এই বিচ্ছিন্ন জনপথে। থাকবে না পিছুটান, থাকবে না মায়া। কিন্তু এসবই কবি মনের অদ্ভূত কল্পনা। যা শুধু স্বপ্নেই সম্ভব।

সকালে ঘুম ভাঙতেই দেখলাম টিমের তিনজন এখনোও গভীর ঘুমে। তবে টিমের বাকি চারজন রুমে নেই। আড়মোরা ভেঙ্গে রুম থেকে বের হতেই দেখলাম নিচে বসেছে এক এলাহী কান্ড। আমাদের একজন টিমমেট বিশাল আকারের দুইটা পাকা পেপে কিনেছে। শুধু কিনেই ক্ষান্ত হয়নি, যাকে পাচ্ছে তাকেই এই পেপে খাওয়াচ্ছে ধরে ধরে। ফ্রেশ হয়ে আমিও ঢুকলাম খাওয়ার দলে। পেপে কাঁচা হোক কিংবা পাকা হোক, বরাবরই এটা আমার প্রিয় ফল। আর পোস্ট কোভিড স্বাস্থ্য সচেতন মানুষ হওয়াও সকালের নাস্তায় এমন ফল পেয়ে ব্যাপক খুশী আমি।

আস্তে আস্তে গভীর ঘুমে থাকা দুজন এসেও পাকা পেপে খাওয়ার দলে ভিড়লো। পেপে খাওয়া শেষ করে চলে গেলাম নাস্তা করতে। ডিম খিচুড়িতে পেট পুজো শেষে রেমাক্রির আশেপাশে একটু ঘোরাফেরার উদ্দেশ্যে বের হলাম। একটু হাটতেই চোখে পড়লো মাঝারি আকারের একটা পুকুর। শীতের শুরুতে হালকা কিছু লাল শাপলা ফুটে আছে সেখানে। তবে পুরো সিজনজুড়ে এখানে যে ভালোই শাপলা ফুটে তা মোটামুটি আঁচ করা যাচ্ছিলো। সেখানে খানিকটা সময় শাপলা বিলাস শেষে চলে গেলাম ছোট একটা টিলার উপর। সেখানে একটা বৌদ্ধ মন্দির আছে। এছাড়াও আছে বুদ্ধদের তীর্থস্থান। খুব সম্ভব ছোট ছোট বাচ্চাদের এখানে বৌদ্ধ ধর্ম সম্পর্কে শিক্ষাদান করা হয়। পাশাপাশিই রেমাক্রি প্রাইমারি স্কুল এবং উচ্চ বিদ্যালয়ের দেখা মিললো সেখানটায়। করোনার কারণে বন্ধ বেশ অনেকটা দিন এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের দিকে তাকালেই বুঝা যাচ্ছিলো।

রেমাক্রি উচ্চ বিদ্যালয়
রেমাক্রি উচ্চ বিদ্যালয়

আশপাশ ঘুরাঘুরি শেষ করে চলে এলাম কটেজে। ব্যাগপ্যাক গুছিয়ে সকাল ১০টা নাগাদ রওনা হলাম রেমাক্রি থেকে থানচি বাজারের উদ্দেশ্যে। তবে পথিমধ্যে বড় পাথরের খানিকটা সামনে অবস্থিত কুমারি ঝর্না অভিযানে ঢু মারা হলো একটু। বড় পাথরের ঐ স্থান থেকে কুমারি ঝর্না খুব একটা দূরে নয়। ৫-১০ মিনিটের হাটার রাস্তা। নৌকা থেকেই দেখা যায় এই ঝর্না। তবে এর আগে রেমাক্রি আসা হলেও এই কুমারি ঝর্নাতে আসা হয়নি কখনো। খুব ছিমছাম ধাঁচের একটা ঝর্না। তবে এই ঝর্নার উপর থেকে ট্রেকিং শুরু করলে হয়তো ভেতরের দিকে বড় কোনো ঝর্নার খোঁজ মিললেও মিলতে পারে।

কুমারি ঝর্নায় আমরা
কুমারি ঝর্নায় আমরা

বেশ অনেকটা সময় এখানে কাটিয়ে আবার রওনা হলাম থানচির উদ্দেশ্যে। দুপুর ১২টা নাগাদ আমরা পৌঁছে যাই থানচিতে। গাইডের সাথে অর্থ চুক্তি চুকিয়ে দুপুরের খাওয়া দাওয়ার জন্য বসে পড়লাম থানচির পর্যটক রেস্তোরা। থানচির এই রেস্তোরাটা বেশ ভালোই লাগে। এর আগেও এখানেই এসে খাওয়া দাওয়া করেছিলাম। দুপুরের খাওয়া দাওয়া শেষে এবারের উদ্দেশ্যে বান্দরবান শহর।

যাত্রাপথের সাময়িক সঙ্গী
যাত্রাপথের সাময়িক সঙ্গী

যেহেতু আমাদের হাতে বেশ কিছুটা সময় আছে এবং রাতের বাসও ছাড়বে একটু দেরিতে তাই আমরা পথিমধ্যে কিছুটা ব্রেক নিয়েই বান্দরবান শহরে এসে পৌছাই বিকেল পাচটা নাগাদ। পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী বান্দরবান সেনানিবাসের এলাকাতে হালকা নাস্তা সেড়ে চলে যাই মধ্য পাড়ায়। এটাই মূলত বান্দরবানের অন্যতম আকর্ষনীয় জায়গায় শহরের মধ্যে। ট্র্যাডিশনাল খাবার খাওয়ার জন্য মধ্যপাড়ায় বেশ অনেকগুলো রেস্তোরা আছে। স্থানীয় কিছু খাবার ট্রাই করে এবং সেই সাথে হালকা কেনাকাটা শেষে চলে এলাম বাস স্ট্যান্ড। হাতে এখনো বেশ কিছু সময় বাকি থাকায় রাতের খাবারটাও সেড়ে নেওয়া হলো।

ট্র্যাডিশনাল চিকেন কাবাব
ট্র্যাডিশনাল চিকেন কাবাব

সাড়ে নয়টা নাগাদ উঠে পড়লাম বাসে। সময়মত বাসও ছেড়ে দিলো ঢাকার উদ্দেশ্যে। পাহাড়ি আঁকাবাঁকা রাস্তা পেরিয়ে, গত দুইদিনের অসংখ্য স্মৃতিকে নিয়ে ছুটে চলছি আমার শহরে।