আমাদের যেকোনো ইভেন্টে কেউ একজন যদি টাইম মেইন্টেইন করতে পারে সে হলো অর্নব। যেটাই হোক না কেনো অর্নব সবসময়ই টাইমলি চলে আসবে। ছোটদের ইংরেজি পাংচুয়াল শব্দ দিয়ে বাক্য রচনায় এখন থেকে রহিমের নামের পরিবর্তে অর্নবের নাম ব্যবহার করা যেতেই পারে।

যদিও আমাদের লঞ্চ ছাড়ার সময় রাত আটটা, কিন্তু সবাইকে আমি টাইম বলে রেখেছিলাম সন্ধ্যা সাড়ে সাতটা। এটা কোনোভাবেই অজানা নয়, কেউ দৌড়ে দৌড়ে লঞ্চে উঠবে না, তা হবেই না। তাই নির্দিষ্ট সময় বললে টাইম মেইনটেইন করাটা আরো বেশী ডিফিকাল্ট হয়ে যেতো। অর্নব অবশ্য অতি পাংচুয়াল ছিলো সেদিন, বিকেল সাড়ে চারটা নাগাদই পৌছে যায় সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনালে। তবে সেটার অবশ্য অন্য কারণ রয়েছে। অর্ধশত বছরের পুরোনো ক্যাফে কর্নারের কাকলেট খাওয়ার জন্যই নাকি তার আগে চলে আসা। অন্যদিকে আমিও সন্ধ্যা সাতটার মধ্যেই পৌছে যাই। আমার আগে আগে যাওয়ার বেশ কারণ থাকে। দূর যাত্রায় খাবার কেনা, বুকিং সব ঠিক আছে কি না সব ক্রস চেক করা। এছাড়া জায়গা সঠিকভাবে সবাইকে জানানোও একটা বড় ব্যাপার। সবথেকে বড় কথা অর্গানাইজার হিসেবে যেই দায়িত্ববোধ পালনের কথা সেটাই রক্ষা করা।

সদরঘাট । ছবিঃ জুবায়ের
সদরঘাট । ছবিঃ জুবায়ের

লঞ্চে উঠে অর্নবের সাথে দেখা করে, কেবিন দেখার দায়িত্ব দিয়ে রাতের খাবার এবং টুকিটাকি নাস্তা কিনতে দোকানে যাই। কেনাকাটা শেষে লঞ্চে ফিরে এসে দেখি এখনো কারো আসার নাম নেই। ঐদিকে ঘড়ির কাটা সাড়ে সাতটা ছুইছুই। সাহিদকে কল দিতেই জানলাম, সে নাকি বাইকে বসে ঢাকার জ্যাম উপভোগ করছে। মাঝে মধ্যে আমি বুঝি না, কোথাও যেতে হলে জ্যাম কেনো উপভোগ করতে হবে, দ্রুত রওনা দিলেই হয়। এখানে অবশ্য তার কোনো দোষ নেই, এইদেশের বাস্তবতাই এটা। অন্যদিকে সোয়েব ভাইও জানিয়েছেন উনি যথাসময়ে উপস্থিত হয়ে যাবে। আমিও আশাবাদী উনার এই বানীতে। নতুন মুখ হিসেবে জয়েন করছে এই ট্যুরে দিশান এবং মিতালি। দিশান অবশ্য রাস্তায় আছে, পাপলুর মাধ্যমে সেটা জেনেছিলাম, তবে পাপলু এবং মিতালি একসাথে আসতে গিয়ে প্যারায় পরে গিয়েছে। ছেলেটা হবে বেশ খাটাখাটনি করেছে ট্যুর অর্গানাইজার হিসেবে, তবে এরকম কঠিন জ্যামে আটকে যাবে বুঝতে পারেনি। বারবার আমাকে কল দিয়ে একটা কথাই বলছিলো, ভাই লাস্ট লঞ্চ কয়টায়? এইটা যদি ধরতে না পারে তাহলে পরেরটায় আসবে কোনোরকম ভাবে। ব্যাপারটা সত্যিই এরকম হলে ট্যুরের আনন্দ মলিন হয়ে যেতো অনেকটাই, তবে সেটা হয়নি। ম্যাজিকের মধ্যে সবাই আটটার মধ্যেই চলে এসেছে এবং লঞ্চও ২০ মিনিট দেরিতে ছেড়েছে, যাত্রাটা বোধহয় সবার অনুকূলেই ছিলো। আমাদের উদ্দেশ্যে এবার ভোলা জেলার বেতুয়া ঘাটে।

রাতের খাওয়া-দাওয়া । ছবিঃ সাহিদ
রাতের খাওয়া-দাওয়া । ছবিঃ সাহিদ

এটা বেশ দূরে নদী পথ। সারারাত জার্নি করে সকালে পৌছাবে এই লঞ্চ। ট্যুরের প্রথম দিনের যাত্রা হিসেবে রাতে কারোই ঠিকমত ঘুম হবে এটা অজানা নয় বরং সেটাই হলো। গতবছর কলকাতা থেকে কেনা আমার উনো সেটের উদ্ভোধন হলো এই ট্যুরের লঞ্চ জার্নিতেই এবং সারারাত ধরেই চললো খেলা, চা আর আড্ডা। খেলার জন্য অবশ্য বিশেষ ধন্যবাদ দিতে হয় সোয়েব ভাইকে, উনি না থাকলে উনো খেলার এত নিয়ম জানা হতো না।

বেতুয়া ঘাট । ছবিঃ জুবায়ের
বেতুয়া ঘাট । ছবিঃ জুবায়ের

বেশ কয়েকবার ঘাট দিয়ে সকাল সাড়ে ছয়টা নাগাদ শেষ ঘাট বেতুয়াতে পৌছালাম আমরা। অনেকটা দিন পর নতুন জায়গায়। মহামারীর এই যুগে মুখে মাস্ক লাগিয়ে ঘুরতে বেরিয়েছি। অন্যরকম একটা ব্যাপার। নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি এডভেঞ্চার ক্লাব (আনঅফিশিয়াল)এর বারোতম ট্যুর যা পুরোটাই জুড়েই রয়েছে ক্যাম্পিং এবং এডভেঞ্চার। তবে ঘাটে নামার পর মনে হলো, আমরাই একমাত্র সচেতন এখানে। তবে আমরাও তো ধোয়া তুলছি পাতা নই, সময়ের সাথে সাথে আমরাও অসচেতনের দলে ভীড়ে গিয়েছিলাম।

লঞ্চ ঘাটে ভীড়লে, ঘাটের চিত্র অনেকটা বদলে যায়। কোলাহল আর হইহুল্লোড় শুরু হয় চারিদিকে। সিদ্ধান্ত নেয়াটা খুবই কঠিন এই সময়টায়। এত মানুষের ভীড়ে আমরা যে অন্য শহরের আগুন্তুক তা কিন্তু স্থানীয় জনগন ঠিকই বুঝে ফেলেছিলো। অন্যদিকে জাতি হিসেবে যেহেতু অন্যকে ঠকানো আমাদের রন্ধ্রে বইছে তা কি তো নতুন কিছু নয়। সে যাই হোক, অনেক কথার মারপ্যাচে একটা অটো ঠিক করলাম কচ্ছপিয়া ঘাট পর্যন্ত পৌছে দিবে। ভাড়া ঠিক খেয়াল নেই এখন। তবে খুব একটা বেশীই ছিলো না। আমাদের পিঠ ভর্তি ব্যাগ গুলো উঠিয়ে ফেললাম অটোর ছাদে আর কোনোভাবে ভিতরে বসলাম আমরা। এভাবে জার্নিতে আমরা বরাবরই অভ্যস্ত তাই মানিয়ে নিতে খুব একটা সমস্যা হয় না। তবে বেতুয়া ঘাটে নাস্তার ইচ্ছে থাকলেও, অটোর চালক বলেছেন, চর ফ্যাশনের বাজারে নাকি উন্নত মানের খাবার দোকান আছে, যেখানে ভালো নাস্তা পাওয়া যায়। আর আমরাও সেটাতেই সই। কারণ, আমরা রাস্তায় ঘুমাতে রাজি কিন্তু খেতে হবে স্পেশাল। দিনশেষে পেটপূজোই তো মনপূজো।

অটোতে ব্যাগ বোঝাই করা হচ্ছে । ছবিঃ সোয়েব
অটোতে ব্যাগ বোঝাই করা হচ্ছে । ছবিঃ সোয়েব

বেতুয়া ঘাট থেকে চরফ্যাশন খুব একটা দূর নয়। ২০-২৫ মিনিটের পথ। বেশ সুন্দর রাস্তা। তাই যেতেও বেগ পেতে হয়নি। অটো চালক আমাদের খাবার হোটেলের সামনে নামিয়ে দিয়ে উনি অন্য জায়গায় গাড়ি পার্ক করলেন। আমরা নাস্তা করে নিলাম ইচ্ছেমত। খাবার অতটা ভালো নয় তবে একদম ফেলে দেওয়ার মতও নয়। চর ফ্যাশনের বাজার এলাকায় খানিকটা সময় কাটিয়ে রওনা হলাম কচ্ছপিয়া ঘাটের উদ্দেশ্যে। এই রাস্তাটা অবশ্য অতটা ভালো নয়, তবে আশেপাশের গ্রামীন পরিবেশ মনোমুগ্ধকর। অটোর সামনে বসায়, ঘুম ঘুম ভাব এলেও ঘুমানো খুবই কঠিন। যেকোনো সময় পরে গিয়ে দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। তাই ঘুমের পরিবর্তে ঝিমাচ্ছিলাম। ঝিমাতে ঝিমাতে প্রায় ঘন্টাখানেক পর চলে এলাম কচ্ছপিয়া ঘাটে। ঘাটের অবস্থা দেখে তো মাথা খারাপ। এত মানুষ আর সাউন্ড পার্টির লোকজন। মনে হচ্ছিলো কেনো আসলাম এখানে? এসে কি বিপদে পড়লাম। এই লোকদের সাথে থাকতে হলে তো পুরো প্ল্যানই মাটি হয়ে যাবে।

ম্যাপ । ছবিঃ সোয়েব
ম্যাপ । ছবিঃ সোয়েব

মাঝে মধ্যে এই দেশের মানুষের সাইকোলজি বুঝতে সমস্যা হয়, নদীর উপর নৌকা দিয়ে ঘুরবে আর বড় বড় সাউন্ড বক্স লাগাই নাচবে এবং সেই সাথে বিরিয়ানী খেয়ে সেটার প্যাকেট নদীতে ফেলবে। আশ্চর্য এক বিচার বুদ্ধিহীন মুর্খ মানুষজন।

আগে থেকে ঠিক করে রাখা ট্রলার ঘাটেই ছিলো। এই ট্রলারই আমাদের আগামী দুইদিনের প্রাইভেট কার সমতুল্য। এখানেই হবে রান্না/বান্না, আর ক্যাম্প করা হবে প্রায় জনমানব শূন্য চরে। কিন্তু মাঝিকে চুলার কথা, হাড়ি পাতিলের কথা আগে থেকে বলা হয়নি দেখে কোনো কিছুই রেডি নাই। অন্যদিকে আমরা নিজেরা রান্না করবো, তাই বাজারও করতে হবে। ট্রলারে অর্নব, মিতালি এবং দিশানকে দায়িত্ব দিয়ে, আমি, সোয়েব ভাই, পাপলু এবং সাহিদ চলে যাই বাজারে। দুইদিনের রান্না/বান্নার জন্য বাজার করা। এটা এক বিশাল দায়িত্ব এবং সত্যিকার অর্থে জটিল কাজ। কাজটা আরো বেশী জটিল হয়ে গিয়েছে এই কচ্ছপিয়া ঘাটের জন্য। এখানের বাজারে সদাই না বললেই চলে। তারপরেও টুকিটাকি ভালোইভাবে এদিক সেদিক করে জোগাড় করতে পেরেছিলাম।

বাজার সদাই নিয়ে চলছি তেপান্তরে । ছবিঃ জুবায়ের
বাজার সদাই নিয়ে চলছি তেপান্তরে । ছবিঃ জুবায়ের

বাজার সদাই শেষ করে ট্রলার ছাড়তে ছাড়তে দুপুর ২টা বেজে গিয়েছে। সেখান থেকে রওনা হলাম চর কুকরি-মুকরির উদ্দেশ্যে। কিন্তু এই কি, ৪০ মিনিটের মধ্যেই পৌছে গেলাম এখানে? এত কাছে। এত কাছে তো হবার নয় এবং এইটা দেখতে তো ছবির মতও নয়। মাঝিকে বুঝানোর চেষ্টা করলাম, আমরা কোথায় যাবো, অতঃপর তিনি বুঝতে পেরে ঘন্টাখানেক পথ পেরিয়ে পৌছে গেলাম চর কুকরি-মুকরির শেষ প্রান্ত নারিকেল বাগানে। আমরা যখন নারিকেল বাগানে পৌছাই তখন বিকেল চারটা বাজে প্রায়। কিন্তু সেখানে গিয়ে দেখি অনেক মানুষ, তবে বেশীরভাগই স্থানীয় এবং উনারা ডে ট্রিপেই এসেছেন। একটু পরেই চলে যাবেন। উনারা চলে যাবেন শুনে অনেক বেশীই আনন্দিত হচ্ছিলাম। যাক, নিরিবিলি পরিবেশে থাকা যাবে।
ঘাটে ট্রলার বাধিয়ে দিয়ে, নারিকেল বাগানের ভিতরের দিকে চলে গেলাম। ক্যাম্পিং-এর জন্য বেশ চমৎকার একটা জায়গায় ঠিক করলাম। আসলে সেদিন ওখানে আমরা ছাড়া আর কোনো গ্রুপই ক্যাম্পিং করতে আসেনি, যার কারনে জায়গা পছন্দ করতেও সমস্যা হয়নি। রান্না উপকরন নিয়ে চুলা লাগিয়ে ছোটখাটো একটা রান্নাঘর বানিয়ে ফেললাম। তাবুগুলো লাগিয়ে, ক্যাম্প ফায়ার জ্বালিয়ে একটা জায়গা জুড়ো পুরো আস্তানা গড়ে তোলা। এযেনো আমাদের ঘর, হোক সেটা একরাতেরই ঘর।

একদিনের আস্তানা । ছবিঃ দিশান
একদিনের আস্তানা । ছবিঃ দিশান

সবাই রান্নার কাজ যে যার মত করে যাচ্ছে। কি ছিলো না সেদিনের মেন্যুতে। হাঁসের ঝাল ভুনা, খিচুড়ি, বেগুন ভাজা, ডিম ভুনা, নুডলস। ইংরেজি বছরের শেষ দিন এবং আকাশে ইয়া বড় এক পূর্নিমার চাঁদকে উপলক্ষ্য করেই আমাদের এত আয়োজন। রান্না করতে অবশ্য রাত এগারটার মত বেজে যায়, তারপরেও একসাথে বসে খাওয়া, জোছনা স্নান, তীব্র হিমেল হাওয়া, সবকিছু মিলিয়ে অন্যরকম একটা সময় কাটছিলো। যান্ত্রিক জীবনের সকল যন্ত্রনাকে ভুলে থাকার জন্য এই পরিবেশের বেশ প্রয়োজন।